নিম আর হলুদ, দুটি এমন উপাদান যা আমরা আমাদের রোজের জীবনে খুব কাজে লাগে। আমাদের শরীর ভাল রাখতে যেমন এই দুই উপাদানের গুরুত্ব অনেক, তেমনই আমাদের স্কিন ভিতর থেকে সুন্দর করে তুলতেও নিম আর হলুদের জুড়ি মেলা ভার। তবে এই দুই প্রাকৃতিক উপাদানকে কেমন করে ব্যবহার করলে আপনাদের ত্বক সার্বিক ভাবে ভাল থাকবে সেটা জানা কিন্তু খুব দরকার।
কেন নিম আর হলুদ এতো উপকারী? নিম আর হলুদ কীভাবে ব্যবহার করলে আপনারা সবচেয়ে ভাল উপকার পেতে পারেন সেটা তো জানাবোই। কিন্তু তার আগে আপনাদের জানতে হবে কেন নিম আর হলুদ এতো বেশি উপকারী। কি এমন আছে এদের মধ্যে যার জন্য এই দুই প্রাকৃতিক উপাদান এই পরিমাণে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। নিমে আছে লেসিথিন আর লিপিড ন্যানো পার্টিকেল। এই জন্য এটি একটি অন্যতম অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান।
তাই যাদের তেলতেলে ত্বক, যাদের ব্রণ, র্যা শ বেশি হয়, তাঁদের জন্য নিম খুবই উপকারী। স্কিনে ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ অনেক কম করতে পারে নিম এই দুই উপাদানের জন্য। এছাড়াও নিমে আছে এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড আর ভিটামিন ই। তাই নিম ত্বকের শুষ্কতা অনেক কমিয়ে আনতে পারে সহজে। কোলাজেন তৈরি করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায় আর কম বয়সের ছোঁয়া বজায় রাখে। হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল আর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান স্কিনের এ টু জেড সব ধরণের সমস্যার ক্ষেত্রে কার্যকরী।
আর ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে হলুদ তো কবে থেকে একাই হিট। তেলতেলে ত্বকের জন্যঃ সবার আগে আমরা আলোচনা করব অয়েলি স্কিনের জন্য নিম আর হলুদ কি ধরণের উপকার দিতে পারে। নানা রকম সমস্যা থাকে এই ধরণের স্কিনের মানুষদের। র্যাশ, ব্রণ, ব্রণর দাগ, তেলতেলে ভাব আর উজ্জ্বলতা কম হওয়া, এই পাঁচটি তার মধ্যে অন্যতম। আমরা তাই এক এক করে এই পাঁচ সমস্যার সমাধানে নিম আর হলুদের ব্যবহার দেখব।
১. র্যাশ কমাতেঃ র্যাশ সবচেয়ে বেশি ভোগায় তেলতেলে ত্বকের মানুষদের। তার জন্য নিম, হলুদ আর লেবুর রসের প্যাক অনবদ্য।
উপকরণঃ নিমপাতা ১০টা মতো, হলুদ বাটা ১ চামচ, লেবুর রস ১ চামচ
পদ্ধতিঃ নিমপাতা আগে জলে ভিজিয়ে রাখুন ৩০ মিনিট মতো। কাঁচা হলুদ বেটে ১ চামচ নিয়ে নিন। এবার ওই নিমপাতা বাটা, হলুদ আর লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে ঘন পেস্ট বানান। এই পেস্ট মুখে মাখুন আর ৩০ মিনিট অপেক্ষ করুন। তারপর সাধারণ জল দিয়ে ধুয়ে নিন। সপ্তাহে তিন দিন করলে খুব ভাল হয়।
২. ব্রণ সারাতেঃ ব্রণ হল সেই সমস্যা যা শুধু দেখতে খারাপ দেখায় তাই নয়, যন্ত্রণা আর কষ্ট দেয়। এর থেকে উপশমের জন্য নিম আর হলুদ মাস্ট।
উপকরণঃ নিমপাতা ১০টা মতো, হলুদ গুঁড়ো, রসুন ৩ কোয়া
পদ্ধতিঃ আগে থেকে নিম ভিজিয়ে রাখুন উষ্ণ গরম জলে। এবার জল থেকে তুলে নিমপাতা বেটে নিন। এর সঙ্গে মিশিয়ে নিন অরগানিক হলুদ গুঁড়ো আর ৩ কোয়া থেঁতো করা রসুন। ভালও করে মিশিয়ে ব্রণ হওয়া জায়গায় লাগান। গোটা মুখেও লাগাতে পারেন। ২০ মিনিট রেখে অল্প উষ্ণ জলে মুখ হাল্কা হাতে পরিষ্কার করে নিন। এক দিন ছাড়া ছাড়া করলে খুব ভাল ফল পাবেন।
৩. ব্রণর দাগ সারাতেঃ ব্রণ চলে গেলেও ব্রণর দাগ যেতেই চায় না যেন। কিন্তু নিম আর হলুদ একসঙ্গে থাকলে দাগ যেতে বাধ্য।
উপকরণঃ নিমের গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, চন্দন গুঁড়ো
পদ্ধতিঃ তিন ধরণের গুঁড়ো ভাল ব্র্যান্ডের পেয়ে যাবেন অনলাইনে। একটি পাত্রে এই তিন ধরণের গুঁড়ো অল্প অল্প জল দিয়ে মিশিয়ে মুখে মাখুন। ৩০ মিনিট মতো রেখে সাধারণ জলে ধুয়ে নিন। সপ্তাহে দুই দিন করলে খুব ভাল ফল পাবেন।
৪. তেলতেলে ভাব কমাতেঃ সারা দিন নাকের চারপাশে তেলতেলে ভাব, চিটচিটে ভাব, কার ভাল লাগে বলুন তো! এর থেকে রেহাই পাওয়া এখন খুব সহজ।
উপকরণঃ নিমপাতা ১৫টা মতো। হলুদ বাটা ১ চামচ, গোলাপ জল ২ চামচ
পদ্ধতিঃ নিমপাতা আর হলুদ বেটে নেবেন। কিন্তু এমন করে বাটবেন যেন একটু একটু দানা দানা মতো মুখে লাগে। এর সঙ্গে গোলাপ জল মিশিয়ে একটা মোটামুটি স্ক্রাব করার মতো পেস্ট করে নিন। রোজ স্নানের সময় এটি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। দুই সপ্তাহের মধ্যে তেলতেলে ভাব অনেক কমে যাবে।
৫. উজ্জ্বলতা বাড়াতেঃ তেলতেলে ত্বকের অতিরিক্ত তেলের জন্য মুখ অনুজ্জ্বল দেখায়। তেল কমে আসবে এমনিতেই মুখ অনেক পরিষ্কার লাগবে। তাও এই প্যাকটি অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা আনবে।
উপকরণঃ ২ চামচ নিম তেল, ১ চামচ হলুদ গুঁড়ো, ১ চামচ পাকা পেঁপে বাটা
পদ্ধতিঃ অনলাইনে নিম তেল পেয়ে যাবেন। একটি পাত্রে নিম তেল, হলুদ বাটা আর পাকা পেঁপে বাটা মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ মুখে লাগিয়ে হাল্কা হাতে ম্যাসাজ করুন। তারপর এক ঘণ্টা রেখে দিন। মুখ ধুয়ে নিন অল্প উষ্ণ জলে। প্রতি সপ্তাহে এক দিন করুন। অনবদ্য ফল পাবেন।
৬. শুষ্ক ত্বকের জন্যঃ শুষ্ক ত্বকের জন্য এই শীতকাল খুবই সমস্যার। যদিও সারা বছরেই এই স্কিনের মানুষদের ত্বক খুব শুষ্ক আর রুক্ষ থাকে। তার ফলে মুখে সেরকম উজ্জ্বলতা থাকে না। আর হয় বলিরেখা, বয়সের ছাপ আগে আসার মতো কিছু সমস্যা। নিম আর হলুদের মিশ্রণ এই ত্বকের জন্য আশীর্বাদের মতো কাজ করবে। নিম ভিতর থেকে ত্বকের পি.এইচ ব্যাল্যান্স ঠিক করে। আর তার সঙ্গে হলুদ তো আছেই।
উপকরণঃ ৩ চামচ নিমতেল, হলুদ বাটা ১ চামচ, গোলাপ জল
পদ্ধতিঃ তিনটি উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে নিন। হলুদ বাটা অবশ্য সরাসরি দেবেন না। হলুদ বাটা জলে গুলে সেটি ছেঁকে সেই জল দেবেন। মানে হলুদ বাটা জল, নিম তেল আর গোলাপ জলের একটি জলজলে মিশ্রণ হবে। এটি টোনার হিসেবে পরিষ্কার মুখে দিনে যতবার পারবেন মুখে দেবেন। মুখ টেনে নেবে, তাই ধোয়ার দরকার নেই।
৭. বলিরেখা আটকাতেঃ ড্রাই স্কিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা এই বলিরেখা বা ফাইন লাইনস আসা। এতে বয়স এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়। দেখতেও ভাল লাগে না।
উপকরণঃ নিমপাতা ৮টা মতো, হলুদ বাটা, টম্যাটো বাটা ২ চামচ
পদ্ধতিঃ তিনটি উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে নিন। মুখে, বিশেষ করে কপালে আর গালে মেখে ২০ মিনিট রেখে দিন। তারপর ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে নিন। এক দিন ছাড়া ছাড়া করুন খুব ভাল ফল পেতে। এতে স্কিন টানটান হবে।
৮. বলিরেখা আটকাতে দ্বিতীয় প্যাকঃ ড্রাই স্কিনের সমস্যা হল ত্বকে জলের অভাব। এর জন্য নিম আর হলুদের সঙ্গে রইল শশা।
উপকরণঃ নিমপাতা বাটা ২ চামচ, হলুদ বাটা হাফ চামচ, শশার পেস্ট ২ চামচ
পদ্ধতিঃ তিনটি উপকরণ মিশিয়ে মুখে মেখে রেখে দিন ৩০ মিনিট। হাল্কা উষ্ণ জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন ৩০ মিনিট পর। কোনও ম্যাসাজ করার দরকার নেই। সপ্তাহে তিন দিন করুন।
৯. বয়সের ছাপ আটকাতেঃ বলিরেখা, স্কিনের অনুজ্জ্বল ভাব এইসব হওয়ার জন্য বয়স অনেক বেশি লাগে। কিন্তু আমাদের তো কম বয়সি তারুণ্য বেশি প্রিয়। নিম আর হলুদ আপনাকে সেই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে।
উপকরণঃ নিমের তেল, হলুদ বাটা অল্প, নারকেল তেল ১ চামচ
পদ্ধতিঃ নিমের তেল আর নারকেল তেল ভাল করে মিশিয়ে তার মধ্যে অল্প হলুদ বাটা দিন। খুব কম দেবেন। এবার এই মিশ্রণ রোজ রাতে শুতে যাওয়ার আগে মুখে মেখে হাল্কা হাতে ম্যাসাজ করবেন। তারপর একটি তোয়ালে দিয়ে মুছে নেবেন মুখ ১০ মিনিট পর। রোজ এটা করলে দুই সপ্তাহে মুখের ড্রাইনেস অনেক কমে যাবে।
১০. উজ্জ্বলতা বাড়াতেঃ এবার সব হওয়ার পর দরকার উজ্জলতা বাড়ানো। ড্রাই স্কিনের জন্য খুব ভাল প্যাক বলব।
উপকরণঃ নিমপাতা সেদ্ধ জল, হলুদ বাটা জল, বেসন ২ চামচ, মধু হাফ চামচ, কেশর, দুধের সর বা কাঁচা দুধ
পদ্ধতিঃ আগে পাত্রে বেসন, কেশর দুধে ভিজিয়ে রাখা আর মধু নিয়ে মিশিয়ে নিন। এবার এর মধ্যে নিম সেদ্ধ জল আর হলুদ বাটা জল পরিমাণ মতো দিন। খুব পাতলা পেস্ট কিন্তু হবে না। এবার বাকি ঘনত্ব ঠিক রেখে দুধ বা মালাই দিন। এই প্যাক মুখে মেখে ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। হাল্কা হাতে ম্যাসাজ করতে পারেন। মুখ অল্প উষ্ণ জলে ধুয়ে নিন। সপ্তাহে এক দিন করেই করুন খুব ভালও ফল পেতে।
সাধারণ ত্বকের যত্ন
সাধারণ বা নর্মাল স্কিন যাদের তাঁদের তো সেরকম সমস্যা থাকে না। কিন্তু তাঁদের স্কিন ক্রমাগত যত্ন করে যেতে হয়। আর মুখে যাতে অল্প বিস্তর র্যা শ না হয়, উজ্জ্বল থাকে মুখ তার জন্য তো কিছু ফেস প্যাক ব্যবহার করাই উচিত।













































