প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

লবণশিল্পের বিপর্যয় ও চাষিদের দুর্গতি

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে উৎপাদিত লবণকে ঘিরে বাংলাদেশে বৃহৎ লবণশিল্প গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা সাধারণত লবণ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। উল্লেখ্য, বর্তমানে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলাতেও লবণশিল্প দৃশ্যমান। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০-১৫ লাখ মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলসমূহের মানুষ লবণশিল্পকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে যে স্বপ্ন দেখে আসছিল, আজ সেই স্বপ্ন বিপন্নের পথে। লবণশিল্প ও চাষিদের প্রতি তীব্র অবহেলা ও নানা প্রতিবন্ধকতা হল এর মূল কারণ। তবে এর  অন্যতম প্রধান কারণ হলো, চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। সাধারণত মোগল আমল থেকে এই অঞ্চলের মানুষ লবণ উৎপাদনের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত ছিল। তবে তৎকালীন ব্রিটিশদের শোষণ-নির্যাতনের শাসনব্যবস্থায় লবণশিল্পের প্রসার তেমন ঘটতে পারেনি। সেকালে এই অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রের পানি উনুনে সিদ্ধ করে লবণ উৎপাদন করা হতো। উৎপাদন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায়, লবণশিল্পের প্রসারতায় নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবু জীবিকা নির্বাহের জন্য এই অঞ্চলের মানুষ লবণ শিল্পের সঙ্গে যুগ যুগ ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর, এই অঞ্চলের মানুষ নতুন উদ্যমে, লবণ উৎপাদন শুরু করলেও পাকিস্তানি শাসকরা এই শিল্পের ওপর অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক আরোপ করে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এই শিল্প ক্রমশ প্রসারতা লাভ করে। তাদের এই শিল্পের প্রয়োজনীয়তা ও প্রসারতা দেখে বাংলাদেশ সরকার মুগ্ধ হয়। তাই সরকার ১৯৯০ সালে এই লবণ শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এই শিল্পকে বাংলাদেশ শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই করপোরেশনের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণশিল্পের মধ্যে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করে তোলার জন্য সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই সময়ে বিশেষজ্ঞরা লবণ উৎপাদন প্রক্রিয়া আরো সহজলভ্য করার লক্ষ্যে, ২০০১ সালের  দিকে পলিথিন মাটিতে বিছিয়ে লবণ উৎপাদনের কৌশল শিখিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের লবণ চাষের নতুন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ পেশাগতভাবে লবণচাষি হয়ে যায়। ফলে প্রতিবছর অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত পলিথিন পদ্ধতিতে, সনাতন পদ্ধতির তুলনায় ৩৫ শতাংশের অধিক ও আন্তর্জাতিক মানের লবণ উৎপাদন তৈরি হয়েছিল, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করার সুর্বণ সুযোগ উন্মোচিত হয়।

বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের লবণশিল্পের ব্যাপক পরিসরে প্রসারতা লাভ করেছে। কেননা এই শতাব্দীর শুরুতেই, দেশে লবণের পর্যাপ্ত পরিমাণ চাহিদা ও উচ্চমূল্যে লবণ বিক্রি করা হয়েছিল। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের এই সমৃদ্ধি দেখে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে লবণ চাষের জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে ওতোপ্রোতভাবে জনগণ এই শিল্পে জড়িত হয়ে পড়ে। স্থানীয় অনেক মহাজন এই শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পরিশ্রম করে। অবশেষে এই অঞ্চলের স্থানীয় মহাজন ও লবণ কৃষকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের বৃহৎ লবণশিল্প গড়ে ওঠে। তদানীন্তন সময়ে দেশে লবণের ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা লবণ উচ্চমূল্যে বিক্রি করেছিল। চাষিদের পাশাপাশি স্থানীয় মহাজনরাও এই লাভজনক ব্যবসা করে অর্থনৈতিক ভাবে উপকৃত হয়েছিল। এই লবণশিল্প উপকূলীয় এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক ব্যাপক পরিবর্তনের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও অগ্রণী ভূমিকা রাখে। জাতীয় অর্থনীতিতে লবণশিল্প খাত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার অবদান রাখছে। লবণ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া ও উচ্চমূল্য থাকায় কৃষকরা আনন্দিত ও অনেক উৎসাহ উদ্দীপনায় লবণ চাষে নিয়োজিত হয়েছিল। তাছাড়া গত চার বছর আগেও প্রতিমণ লবণের দাম সাধারণত ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে লবণচাষিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিল। এই অঞ্চলের শিল্পের প্রসারতা দেখে মুগ্ধ হয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ঋণ সংস্থাগুলো এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত চাষিদের জন্য বিনিয়োগের সুব্যবস্থা করে। অসংখ্য লবণ গুদামসহ বিভিন্ন প্রকার স্থাপনা তৈরি হয়েছিল এই শিল্পকে কেন্দ্র করে।

দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, আজ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন অত্যন্ত বিপন্ন। কেননা বিগত তিন বছর ধরে বাংলাদেশের লবণের দাম আশানুরূপ নয়। সমপ্রতি চাষিদের  প্রতিমণ লবণ শুধু ৬০ থেকে ৭০ টাকায়ও বিক্রি করতে হয়েছে। চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশায় থাকলেও, আজ পর্যন্ত তারা কোনো সন্তোষজনক মূল্য পাচ্ছে না। ফলে চাষিরা সংসারের অভাব মেটানোর জন্য স্থানীয় ঋণ সংস্থাগুলোর কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, ইতোমধ্যে অনেক চাষি ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি তালিকায় তাদের নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া করোনা মহামারীর জন্য দেশব্যাপী লকডাউন চলাকালে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি হলেও, উপকূলীয় এলাকার উৎপাদিত লবণের মূল্য খুবই কম। বাজারে সব পণ্যের দাম উচ্চ মূল্য হওয়ার কারণে, চাষিরা পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো সহজে মেটাতে পারছে না। যার ফলে দেখা যাচ্ছে তারা অতীতের মতো আর আগ্রহের সঙ্গে এখন লবণ উৎপাদন করছে না। গত দুই বছরে এ অঞ্চলের অনেক লবণচাষি লবণ উৎপাদনে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। ফলে দেখা গেছে, এই অঞ্চলের অনেক আবাদি জমি লবণ উৎপাদন না হওয়ার কারণে সারা বছর অনাবাদী থাকছে।

জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক চাষি লবণশিল্পকে ছেড়ে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে শহরমুখী হয়ে যাচ্ছে। ফলে দিন দিন বাংলাদেশের বৃহৎ লবণ শিল্পের প্রসারতার পরিবর্তে ক্রমশ হ্রস্ব হচ্ছে, যা বাংলাদেশের লবণ শিল্পের বিলুপ্তির পথ সুগম করে দিবে। অস্বীকার করা যাবে না, বাংলাদেশের অতীতের অনেক জনপ্রিয় শিল্প, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একইভাবে আজকের লবণ শিল্পের বর্তমান অবস্থার উন্নতির জন্য যদি কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আগামীতে এই শিল্প আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্তি হয়ে যাবে। এদেশের বৃহৎ লবণশিল্প যদি বিলুপ্তি ঘটে, তাহলে উপকূলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের জন্য তেমন কোনো অনুকূল উপায় আর থাকবে না। কেননা সারা বছর এই অঞ্চলের সকল নদীর পানিগুলো লবণাক্ত হওয়ায়, বেশিরভাগ জমিতে বছরে ছয় মাস লবণ উৎপাদন ছাড়া অন্য কিছু করা যায় না। যদি আজকে দেশের লবণ শিল্পের নানা অবহেলায় বিলুপ্তি ঘটে, তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের ভবিষ্যতে জীবিকা নির্বাহে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। একই সঙ্গে দেশে বেকারত্বের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে, যা আমাদের উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

উল্লেখ্য, অধিকাংশ চাষি অল্প শিক্ষিত হওয়ায়, তারা তাদের ন্যায্য দাবিগুলো নিয়ে কোনো প্রকার জোরালো প্রতিবাদ করতে পারে না। তাই সর্বোপরি দেশ ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্য মাননীয় শিল্পমন্ত্রী ও বাংলাদেশ লবণশিল্প করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত হবে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার বৃহৎ লবণ শিল্পকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রীয়ভাবে লবণের উচ্চ মূল্য দেওয়া সম্ভব না হলেও, লবণ শিল্প রক্ষার্থে চাষিদের সার্বিক কল্যাণের জন্য অন্ততপক্ষে উৎপাদিত লবণের একটি সন্তোষজনক মূল্য নির্ধারণ করা দরকার। যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে লবণের ন্যায্যমূল্য না থাকাকালীন লবণ চাষিদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি এই শিল্পকে রক্ষার জন্য স্থানীয় মহাজনরাও কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারে, যেমন— জমি বণ্টনের সময় অগ্রিম টাকা গ্রহণ ও মাত্রাতিরিক্তি খাজনা নেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং দুর্দিনে চাষিদের আর্থিক সহয়তা প্রদান করা।

দেশীয় লবণশিল্প রক্ষা ও লবণচাষিদের জীবনমান বাঁচাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই।

আসাদুজ্জামান সম্রাট

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়