প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

মুনিয়ার মৃত্যু, কিছু অনাকাঙ্খিত প্রশ্ন

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

গত ২৬ এপ্রিল রাতে গুলশানের একটি ফ্লাটে মোসারাত জাহান মুনিয়ার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই লাশ উদ্ধারের পর ছুটে আসেন মুনিয়ার বড় বোন, থানায় মামলা করেছেন আত্মহত্যার প্ররোচনার। এই মামলাটি যেহেতু বিচারাধীন কাজেই এই মামলার সত্য মিথ্যা সেই বিতর্কে যাব না। কিন্তু মুনিয়ার এই আত্মহত্যা, তার অভিভাবকদের ভূমিকা এই ঘটনা নিয়ে কিছু ব্যক্তির অজানা বিকৃত উল্লাস কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক এবং অনাকাঙ্খিত ঘটনা। এরকম কৈশোর উত্তীর্ণ একটি তরুণ প্রাণের মৃত্যু যে কারণেই হোক না কেন সেটি কাম্য নয়, এটি দুঃখজনক। এই মৃত্যুর জন্য যদি কেউ দায়ি থাকে তাহলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হোক। কিন্তু এই মৃত্যু আমাদের সমাজ ও অভিভাবকদের দায়িত্ব সম্পর্কে বেশকিছু অনাকাঙ্খিত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

১. মুনিয়া ১ লাখ টাকা ভাড়ায় একটি ফ্লাটে থাকতো। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সে একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলো। একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ১ লাখ টাকায় গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ফ্লাট ভাড়া করে থাকে অথচ তার অভিভাবকরা যিনি মৃত্যুর পর আকূল কান্নায় ভেঙে পড়েন, দৌড়ে ছুটে আসেন, মামলা করেন তিনি এসব কীভাবে নীরবে হজম করেন। যিনি এখন কান্না করছেন, যে অভিভাবক এখন মামলা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন অজানা প্রাপ্তির আশা নিয়ে তিনি সেসময় কোথায় ছিলেন? তিনি কি তার বোনকে কখনও জিজ্ঞেস করেছিলেন ১ লাখ টাকার ফ্লাটে সে কীভাবে থাকে? এই অনৈতিক জীবন যাপনের ব্যাপারে কি বাধা দিয়েছিলেন তিনি?

২. নুসরাত জাহান ছুটে এসেছেন, এসে তিনি আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা করেছেন। এই মামলা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু এই ঘটনার আগে-পরে মুনিয়ার জীবন কাহিনী কি তিনি জানতেন? তাহলে তার ভূমিকা কি ছিলো?

৩. মুনিয়াকে যারা বাড়িভাড়া দিয়েছিলো এরকম উঠতি বয়সি একটি বাচ্চা মেয়ে একা একটি বাসায় ভাড়া থাকে যার কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই। বাড়িওয়ালা কি ভাড়াটের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছিলেন যে এতো টাকা ভাড়া দেয়ার সক্ষমতা এই মেয়েটির আছে কি না বা এভাবে তিনি থাকবেন কি না?

৪. মুনিয়ার মৃত্যুর পর একটি বিশেষ মহল যেন উল্লাসে ফেঁটে পড়েছে। এই মৃত্যুতে তারা যতো না দুঃখিত তার চেয়ে আনন্দিত। একটি শিল্প গ্রুপকে নিশানা করতে পেরেছে। সামাজিক মাধ্যমে মুনিয়ার মৃত্যু নিয়ে সত্য মিথ্যা নানা রকম কাহিনী প্রকাশিত এর কতটুকু সত্য সে বিবেচনার দায়িত্ব পাঠকদের। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি অংশের মধ্যে এই মৃত্যু পর এক ধরনের উল্লাস দেখা যাচ্ছে। কারণ মৃত্যুর পর মুনিয়ার বোন যে মামলা করেছেন সেই মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে মুনিয়ার যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিলো কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়। কিন্তু দেশের অন্যতম একটি শিল্প গ্রুপ যারা দেশের কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবদান রাখছে। এক মুনিয়ার মৃত্যুতে পুরো বসুন্ধরাকে আক্রমণ করাটা কতটা যুক্তিসংগত নাকি এটা বসুন্ধরাকে নিয়ে এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা। আমরা অনেক সময় দেখি যে অন্যের ক্ষতি দেখলে নিজেরা উল্লসিত হই সেরকম একটি উল্লাস দেখা যাচ্ছে মুনিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে।

৫. মুনিয়ার জীবনযাপন নিয়ে এখন অনেক কিছুই বের হচ্ছে। চট্টগ্রামের এক হুইপ পূত্রের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের কথাও সামাজিক মাধ্যমে ঘুড়পাক খাচ্ছে, ঘুরপাক খাচ্ছে আরও সম্পর্কের কথা। একটি ১৯ বছর মতান্তরে ২১ বছরের একটি মেয়ে কীভাবে এতোগুলো সম্পর্কে জড়ায় সেটিও একটি চিন্তার বিষয়। আমাদের সমাজ কোন পথে যাচ্ছে, অর্থলোভের কাছে কি সবকিছু বশীভূত হয়ে যাচ্ছে, আমরা কি অর্থের কাছেই আমাদের প্রেম-ভালোবাসা সবকিছু জিম্মি করছি।

৬. সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে নুসরাতের পরিবারকে চালাতেন মুনিয়া। তাহলে কি মুনিয়া কি নুসরাতের পোষা বিড়াল ছিলো। যার (নুসরাতের) সোনার ডিমপাড়া হাঁস ছিলো মুনিয়া। যে মুনিয়া থাকলে তাদের সবকিছু থাকবে, মুনিয়া না থাকার কারণে তাদের কিছুই নেই। মুনিয়ার মৃত্যুতে নুসরাত জাহান কি শোকাহত নাকি তার সোনার ডিমপাড়া হাঁসটি হারিয়েছেন তার জন্য দুঃখিত। এই প্রশ্নগুলো আমাদের সমাজের বিভৎস দিকগুলোকে উন্মোচিত করে। আমরা এই বিভৎস দিকগুলোকে যদি উন্মোচিত না করি তাহলে আমরা কিছু ফন্দিফিকির করবো, কিছু আর্থিক লাভবান হওয়ার চেষ্টা করবো এবং একসময় আমরা সবকিছু ভুলে যাবো। এক মুনিয়া মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের সমাজ এবং মুনিয়ার অভিভাবক আমাদের চারপাশ মুনিয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুর উৎসব করছে।