প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

‘বঙ্গভ্যাক্সের’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আটকে আছে

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

দেশে করোনার টিকা কার্যক্রম চলমান রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ গত নভেম্বরে বেসরকারি কোম্পানি বেক্সিমকোর মাধ্যমে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি টিকা কেনার চুক্তি করেছিল সরকার। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে টিকা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানে এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ ভারতের সাথে চুক্তির পর অনেকটাই নির্ভার ছিল সরকার। ফলে এখন টিকা কার্যক্রম সচল রাখা নিয়ে একদিকে যেমনি সংকট ও সরকার অস্বস্তিতে রয়েছে, তেমনি হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।

দেশের এমন সংকটময় মুহূর্তে আলোচনায় উঠেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের টিকার বিষয়টি। দেশজুড়ে সাড়া জাগানো গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্লোবের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদনের জন্য গত প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল-বিএমআরসি’তে ফাইলবন্দি রয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ক্লিয়ারেন্সের জন্য গত ১৭ জানুয়ারি বিএমআরসি’র কাছে আবেদন করে গ্লোব কর্তৃপক্ষ। এরপর বিএমআরসি ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখে গ্লোবের কাছে শতাধিক টার্ম সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি দেয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গব্যক্সের পক্ষ থেকে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর থেকে বিএমআরসি অদৃশ্য কারণে নীরব রয়েছে। তারা এ ব্যাপারে আর কোনো উত্তর দেয়নি।

এ প্রসঙ্গে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের হেড অব কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি ডাক্তার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমরা এনিমেল ট্রায়ালের কাজটা শেষ করেছি গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। এরপর অক্টোবর থেকে আমরা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি। গত ১৭ জানুয়ারি বিএমআরসিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদনের জন্য আবেদন জমা দেই। কিন্তু ৩ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে তারা আমাদের আর কোনো উত্তর দেয়নি।’

ডা. মহিউদ্দিন দাবি করেন, বিএমআরসি তাদের কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে তার যথাযথ উত্তর তারা দিয়েছেন। একই সাথে এ পর্যন্ত যে কয়টি ধাপ তাদের পেরুতে হয়েছে তার প্রতিটিই তারা শতভাগ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি জানান, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে হয় থার্ড পার্টির মাধ্যমে। প্রথমে আইসিডিডিআরবি’র সাথে আমরা কাজ শুরু করি। কিন্তু ৩ মাস পর দেখা যায়, আইসিডিডিআরবি’র তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের অভিজ্ঞতা রয়েছে; কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে সেখান থেকে চলে গিয়ে ‘ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেডের’ সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হয় তাদের।

এদিকে গ্লোব বায়োটেকের ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন দিতে বিএমআরসিকে নিষেধ করেছে সরকার। এজন্য সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিকে দায়ী করেছেন বিএমআরসি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। তিনি সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যখন আমরা একটা ফাইনাল স্টেজে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই ভ্যাকসিন (ভারতের ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়) রোল আউট শুরু হয়। তখন সরকার আমাদের নির্দেশ দেয়, এখন যদি অন্য কোনো ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চলে তাহলে কনফ্লিক্ট ইন্টারেস্ট হতে পারে। সুতরাং আমরা না বলা পর্যন্ত এটা বন্ধ থাকবে।

বিএমআরসি’র চেয়ারম্যান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘টেকনিক্যাল কমিটি আছে, অথচ ইন্ট্রাকশন দেয় কেবিনেট সেক্রেটারি। তাহলে এটা কোন সায়েন্সে আছে? আমি তো চুনিপুঁটি মাত্র। সরকার চালাচ্ছে আমলারা।’

একটি ভ্যাকসিন কার্যক্রম চলমান থাকায় আরেকটি ভ্যাকসিনের ট্রায়াল দেওয়া যাবে না সরকারের এমন দাবিকে বিস্ময়কর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, ইউরোপে একাধিক ভ্যাকসিন কার্যক্রম চলমান অবস্থায় অন্য ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হয়েছে।

গ্লোব বায়োটেক কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে টিকার যে সংকট চলছে, যথাসময়ে অনুমোদন পেলে তারা এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারতেন। ফেব্রুয়ারিতেই টিকার প্রয়োগ সম্ভব হতো। একই সঙ্গে এখনো পর্যন্ত যে কটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে তাতে এমআরএনএ প্রযুক্তির এই টিকাটি নিরাপদ এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ডাক্তার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন,   ‘এটি পৃথিবীর সবচেয়ে লেটেস্ট প্রযুক্তি এবং পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যতগুলো টিকা দ্রুত অনুমোদন পেয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা বেশি আমেরিকার মডার্না এবং ফাইজারের ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিন যেসব দেশে প্রয়োগ শুরু করেছে তারা সুফল পাচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরাইলসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করায় এখন সেসব দেশে করোনার প্রকোপ কমে এসেছে। আমরা যদি যথাসময়ে অনুমোদন পেতাম তাহলে বর্তমান সংকট তৈরি হতো না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ল্যাবরেটরি টেস্ট, এনিমেল টেস্টেও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি মডার্না ও ফাইজার দুই ডোজের। কিন্তু আমাদেরটা এক ডোজের। তদুপরি আমাদেরটার কার্যকারিতা বেশি বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটির অনুমোদন পেলে বিশ্বে এমআরএনএ প্রযুক্তির প্রথম এক ডোজের ভ্যাকসিন হিসেবে অনুমোদন পেত। এক ডোজেই যে পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে তা মডার্নার দুই ডোজের চেয়েও বেশি।

এ ছাড়া মডার্না, ফাইজার সংরক্ষণ করতে হয় মাইনাস ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। কিন্তু বঙ্গভ্যাক্স বাসাবাড়ির ফ্রিজের নরমাল জায়গায় এটি এক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। আর ডিপ ফ্রিজে ৬ মাস পর্যন্ত। এ পর্যন্ত যে কয়টি ধাপ পার করতে হয়েছে তা শতভাগ সফলভাবে আমরা পার করেছি।’

এদিকে গ্লোবের টিকা নিতে জার্মানিসহ বেশ কয়েকটি দেশ যোগাযোগ করেছে গ্লোব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। কিন্তু সরকারের রেগুলেটরি বিভাগের অনুমোদনের অভাবে এখন সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে উভয় সংকটে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।