প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

মুনিয়ার জীবনযাপন উচ্চাভিলাষে আমি হতভম্ব

6
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

কি বলবো পুরো ব্যাপারটিতে আমি হতবাক। ফুটফুটে মে’য়েটির বয়স আর ছবি দেখলে নিজের মে’য়ের কথা মনে পড়ে, প্রায় ওর বয়সের কাছাকাছিই তো। মে’য়েকে আমি সবসময় শেখাই পরিশ্রম করে জীবন গড়তে হবে। জীবন চলার পথে কোনো শর্ট’কার্ট নেই।

ঢাকার অ’ভিজাত শ্রেণিতে উঠা বসা’সহ সমস্ত নামকরা ক্লাবের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও চেষ্টা করেছি কত সাধারণ ভাবে সন্তানদের মানুষ করা যায়। ওদের বাবা-মায়ের পরিচিতি নাম ডাক সামাজিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও চেয়েছি সন্তানরা পিতা-মাতার ছত্রছায়ায় নয় নিজেদের সাম’র্থ্য অনুযায়ী নিজেদের মেধায় এগিয়ে যাক, নিজেদের পরিচয় নিজেরাই গড়ে নিক। শিখিয়েছি মানুষদের সম্মান করতে হয়, শিখিয়েছি ‘তুমি একজন সৎ এবং আদর্শ মানুষ’— এটাই তোমা’র সবচেয়ে বড় পরিচয়। পৃথিবীর কোন কিছুর বিনিময়েই আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দেওয়া যাবে না।

গত কয়েকদিন মুনিয়ার মৃ’ত্যু আমাকে যারপরনাই ব্যথিত করেছে। ওর জীবন আচরণ, উচ্চাভিলাষী মন, জীবনযাপন পদ্ধতি— আমি হতভম্ব। বারবার মনে হয়েছে পিতৃমাতৃহীন মুনিয়ার একজন গার্ডিয়ানের বড় বেশি অভাব ছিল।

‘গ্লেমা’রস ওয়ার্ল্ড‘ রূপের বিকিকিনির হাঁট। পা ফেলার আগে জানা দরকার পিছলে পড়ার ভ’য় আছে, এই জগতটা কতোটা পিচ্ছিল, পঙ্কিল আর ভ’য়ঙ্কর ! কেবল এক মুনিয়া নয় খুঁজলে লাখো মুনিয়া গুলশান, বনানী, নিকেতন, সচিবালয়ের আশেপাশে সেগুনবাগিচা, পল্টন এলাকা, সংসদ ভবনের চারিপাশ যেখানে ক্ষমতা আর টাকার অবাধ উড়াউড়ি সেখানেই মুনিয়াদের বাস।

ঢাকা শহরের সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুগুলোতেই সন্ধ্যা নামলেই রূপের পশরা, হাঁকাহাঁকি সওদা। যত এলিট সোসাইটি ততো চড়া দাম। যদিও সত্যতা জানা নেই বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের ‘বিশ্ব সুন্দরী’’ প্রতিযোগিতাসহ, মডেল, সিনেমা’র নায়িকাদের পুরষ্কার পাওয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে রিউমা’র এবং প্রচলিত ধারণা হচ্ছে আগে অনেক জায়গায় হাতবদল হয়ে আসতে হয়।

নামকরা মডেল আর সুন্দরী নায়িকাদের জীবনাচরণের সাথে আয়ের উৎসের বৈসাদৃশ্য এই ধারণাকে আরও পোক্ত করে। ২০০১/২০০২ সময়কালে বেগুনী রঙের ড্রেস পরিহিত বুড়িগঙ্গার তীরে আরেক হতভাগ্য সুন্দরী মডেল তিন্নির নিথর দেহের ছবিটির কথা এখনো মনে পগে। শোনা যায় তিন্নি চাকচিক্য জীবনের হাতছানিতে নায়িকা হওয়ার জন্য নিজের সন্তানকে পর্যন্ত অস্বীকার করতে চেয়েছিল। স্বামী পিয়ালকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিল তাঁর মা হওয়ার কথা কাউকে যেন না বলে। পরিশেষে খল নায়ক অ’ভির হাতে নৃ’শংস মৃ’ত্যু।

ছোট্ট প্রায় কি’শোরী একটি মে’য়ে এতো সহ’জে এতো উচ্চতায় পৌঁছানোর তো কথা নয়! কোন মাধ্যমে কি করে পৌঁছালো! বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে স্বপ্ন সাজানো যতটা সহ’জ পূরণ হওয়া ততোটা কঠিনই নয় রীতিমত দুঃসাধ্য। সে হয়তো জানতোই না এই জীবনে পিছলে পড়ার ভ’য় আছে। মে’য়েটির দোষ মিথ্যাকে সত্য ভেবে অবাস্তব স্বপ্নের জাল বুনেছিল। কোমল হৃদয় প্রত্যাখ্যাত হওয়া আর স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্র’ণা সহ্য করতে পারেনি হয়তোবা। ছোট্ট মে’য়েটির জন্য আমা’র সমবেদনা এবং দোয়া।

মুনিয়ার মৃ’ত্যুর সুষ্ঠু ত’দন্ত হোক, দোষী সাব্যস্ত হলে বিচার হোক চাই। কিন্তু বেঁচে থাকা তিন্নি, মুনিয়া আর তাঁদের পরিবারকে বলবো শর্ট’কার্ট রাস্তায় আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা না করে বর্তমান অবস্থায় নিজেকে সুখী ভাবার চেষ্টা করুন।

টাকা অধিকতর দামি বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি দিবে কিন্তু কখনো সুখ দিবে না। সুখ সবার ক্ষেত্রে একই কেউ হয়তো খোলা আকাশের নিচে ঘাসের উপর শুয়ে থেকে পায় আবার কেউ হয়তো শত কোটি টাকার বাড়িতে লাখ টাকার বিছানায় শুয়েও পায় না।

বস্তুগত প্রাচুর্যের পেছনে না ঘুরে নিজের হৃদয়ের ঐশ্বর্যের প্রতি মনযোগী হন। ধনাঢ্য পুরুষ নয় নিজেকে নিজের মান সম্মান ইজ্জতকে শ্রদ্ধা করতে শিখু’ন, নিজের চাওয়া-পাওয়া গুলোর ব্যাপারে সাবধানী এবং সচেতন হোন। এই সমাজে চারিপাশের অনেকেই রূপ-যৌবনের বেসাতি করে ক্ষমতাশীল, ধনী কিংবা সাকসেসফুল হয়েছে সত্য কিন্তু শ্রদ্ধা ভালবাসা পেতে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। লাখ টাকা দামের ভাড়া বাসায় অসম্মানের জীবনের চেয়ে ভালোবাসার মানুষের সাথে কুঁড়ে ঘরে থাকা অধিকতর সুখ আর সম্মানের।

লেখক: খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি), সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)