গাছ মানব জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাছ মানুষের জীবনে বিন্দু পরিমাণ ক্ষতি করে না। বরং সর্বক্ষেত্রে গাছ আমাদের উপকার করে গেলেও আমরা গাছের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকি। অবাধে মানুষ হত্যা করছে গাছকে। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে অবাধে গাছকে হত্যা করার অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে সর্বত্র। শুধু তাই নয়, গাছের গায়ে পেরেক বা লোহা ঠুকে সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড লাগানো চলছে দেশের সর্বত্র। গাছের যে প্রাণ আছে তা আমরা ভুলে যাচ্ছি অবলীলায়। অথচ গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন পাস হলেও সে আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। ফলে গাছে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন প্রচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে সারা দেশে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন কেন?
মানব সংস্কৃতির বিকাশে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছে গাছ। গাছ উপহার দেয় সুন্দর ও নির্মল জীবন। মানুষের প্রয়োজনেই গাছকে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে দেওয়া উচিত। মানুষের জীবনধারা তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ও মৌলিক চাহিদা পূরণে গাছ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু আমরা আমাদের সবচেয়ে উপকারী বন্ধুটির গায়ে নিষ্ঠুরভাবে পেরেক ঠুকে ক্ষত করে বিজ্ঞাপন প্রচার করে চলেছি, যা অত্যন্ত অমানবিক ও হূদয়বিদারক। গাছের বুকে পেরেক ঠঁকে শুধু যে সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড লাগানো হচ্ছে তা নয়, লাগানো হচ্ছে বিভিন্ন নির্বাচনি পোস্টার, সমাবেশের আমন্ত্রণপত্র, জাতীয় নেতানেত্রীদের আগমনের শুভেচ্ছা, বিশেষ দিবসের শুভেচ্ছা, ঈদ, নববর্ষের শুভেচ্ছাও। নির্বিচারে গাছের বুকে পেরেক ঠুকে ক্ষত করা হলেও এটি দেখার যেন কেউ নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রায় সব গাছই পেরেকের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। প্রায় সব এলাকাতেই গাছে গাছে পেরেক ঠুকে লাগানো হয় হরেক রকমের চটকদার বিজ্ঞাপন। শহরাঞ্চলের গাছগুলো যেন একেকটা জীবন্ত বিজ্ঞাপন বোর্ড। নির্বিচারে বিজ্ঞাপন সাঁটানো থেকে রক্ষা পাচ্ছে না কোনো গাছই।
২০০২ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে গাছে পেরেক ঠঁকে বিজ্ঞাপন সাঁটানোর ব্যাপারে একটি আইন পাস হয়। আইনটি এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। আইনটি কোথাও প্রয়োগ করা হয়েছে তা জানা যায়নি। কোথাও খুব একটা কার্যকর হয়নি আইনের কোনো ধারাও। আইনটি কার্যকর না হওয়ার কারণে গাছে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড-সাইনবোর্ড সাঁটানোর প্রতিযোগিতা চলছে নির্বিচারে। কোনো কোনো গাছে এতই বিজ্ঞাপন সাঁটানো হয়েছে যে গাছের ডালপালা পর্যন্ত দেখা যায় না। পুরো গাছ ঢাকা পড়েছে সাইনবোর্ডের আড়ালে।
গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে ঠুকে জর্জরিত করে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে বিলবোর্ড-সাইনবোর্ড। চারপাশের এমন অনেক দৃশ্যের মাঝে আমাদের চোখ হঠাৎই আটকে যায়। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অবস্থান ও মান প্রচারের জন্য বেছে নেয় এমন এক অদ্ভুত পদ্ধতিকে। একেকটি গাছকে চিহ্নিত করে নির্দ্বিধায় পেরেক ঠুকে তার শরীর ক্ষত করে প্রচার মাধ্যমের সহায়ক পন্থা হিসেবে লাগিয়ে দিচ্ছে রংবেরঙের বিচিত্র সব বিজ্ঞাপন। গাছের শরীর ছিদ্র করে বিজ্ঞাপন টাঙানোর বিষয়টি মর্মান্তিক।
গাছ মানুষের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। গাছ কেবল পরিবেশবান্ধব নয়, জীবনবান্ধবও। মানুষের অবাধ অত্যাচারে প্রকৃতি রুদ্র হয়ে উঠছে। প্রকৃতির রুদ্র আচরণ থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রথমেই প্রয়োজন গাছ রোপণ আর গাছকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়তা করা। গাছের গায়ে অবাধে পেরেক ঠুকে গাছকে ক্ষতবিক্ষত করা কোনোভাবেই সমুচিত নয়। এটি পরিহার করা উচিত। গাছের গায়ে নেমপ্লেট বা সাইনবোর্ড সাঁটানোর প্রয়োজন হলে গাছের গায়ে তার বা রশি দিয়ে তা বেঁধে রাখলেই গাছটি বেঁচে যাবে, বেঁচে যাবে আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতি।
তবে গাছে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড সাঁটানোর ব্যাপারে আইনের প্রয়োগ মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় আমাদের জনসচেতনতা। দেশের সাধারণ মানুষকে গাছে পেরেক বা লোহা ঠুকে বিজ্ঞাপন প্রচারের খারাপ দিক বিষয়ে সচেতন করা গেলে আইন প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ত না। এ বিষয়ে সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। এতে বাঁচবে গাছের প্রাণ, বাঁচবে আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ।
ইসমাইল মাহমুদ
লেখক : নিবন্ধকার












































