বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সারা দুনিয়ার মত বাংলাদেশেও হতাশ, ভয়ার্ত, বিষণ্ণ মানুষর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সারা বিশ্বে ৫ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে। ১৭টি রাষ্ট্রে পরিচালিত ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে ১ জনের বিষণ্ণতা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ আর শিশুদের মধ্যে ১ শতাংশের বিষণ্ণতা রয়েছে বলে ২০১৭ সালের এক জাতীয় জরিপে পাওয়া গেছে। সে হিসাবে দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছে! পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার প্রায় দ্বিগুণ। করোনা মহামারীর কারণে বাংলাদেশে বিষণ্ণতায় মানুষের সংখ্যা, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের মাঝে এখন অনেক বেড়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
নানাবিধ কারণে মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগেন। যার মধ্যে আছে ছোটবেলা থেকে কেউ যদি অবহেলা বা তাচ্ছিল্যের মধ্যে বড় হয়, মাতা-পিতা বা আত্মীয়স্বজন দ্বারা যদি সে অসম ব্যবহার, শারীরিক ও যৌন-নিপীড়নে আক্রান্ত হলে, সন্তান জন্মদান-কালীন সময়ে, মহিলাদের মেনোপোজ হয়ে গেলে, চাকুরীতে বা রোজগারে সমস্যা থাকলে, প্রেমে ব্যর্থ হলে, মারাত্মক শারীরিক রোগ চিহ্নিত হবার পর, সামাজিক ভাবে কেউ যদি আলাদা থাকে, ইত্যাদি।
আমাদের দেশে করোনার কারণে শিশু ও বড়দের অনেকেই তাঁদের নূন্যতম মানসিক ও শারীরিক দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না, নানা কারণে মাতা-পিতা বা আত্মীয়স্বজনের সাথে দূরত্ব বাড়ছে, বন্ধুদের সাথে তাঁদের কষ্ট, আনন্দ কোন কিছুই শেয়ার করে মন হাল্কা করতে পারছেন না, করোনার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছে না অনেকেই, যা তাঁদের পাবার কথা ছিল। এই অনিশ্চয়তাও হতাশ তথা বিষণ্ণ হবার অন্যতম একটা বড় কারণ। বিষণ্ণতার ফলে ঘুমে ব্যাঘাত, ক্লান্তি, খাবারে অরুচি, যৌনাকাঙ্ক্ষা বা কামশক্তি, ব্যথা-যন্ত্রণা, চলাফেরায় কথা বলার সময়েও অলস-ভাব ফুটে ওঠা, অস্থিরতা, অমনোযোগী, বদহজম, ইত্যাদি হয়।
মহামারি করোনাভাইরাসে বিশ্ব যখন টালমাটাল, চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্য-কর্মীরা যখন লাখ লাখ রোগীর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে- এহেন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গত ৭ এপ্রিল ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২১’ পালিত হয়। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিল্ডিং এ ফেয়ারার, হেলদিয়ার ওয়ার্ল্ড’ (একটি সুন্দর এবং সুস্থ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে)।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিষণ্ণতা রোগের বোঝা এর সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করবে। কোনো মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে সেটির কারণে তার ব্যক্তিজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পারিবারিক জীবন বাধাগ্রস্ত হয়; পাশাপাশি বিপুল-সংখ্যক বিষণ্নতাযুক্ত নাগরিকের অনুৎপাদনশীলতা ও চিকিৎসা-ব্যয়ের কারণে রাষ্ট্র ও সমাজে বিষণ্ণতা আর্থসামাজিক প্রভাব তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রতিদিন তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে, বছরে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে—এর মধ্যে বেশির ভাগ আত্মহত্যাই ঘটে বিষণ্ণতার কারণে। আত্মহত্যা প্রতিরোধেও বিষণ্ণতা শনাক্ত আর প্রতিকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিষণ্ণতাকে কেবল একজনের ব্যক্তিগত রোগ হিসেবে ভাবার কারণ নেই, জনস্বাস্থ্যে বিষণ্ণতার প্রভাব ব্যাপক।
বিষণ্ণতাকে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে গেলে বিষণ্ণতার কারণগুলো দেখতে হবে। সামাজিক বৈষম্য, অস্থিরতা, বঞ্চনা আর দারিদ্র্য মনের ওপর বিশেষ চাপ তৈরি করে। কিন্তু বর্তমানে করোনা, লোক ডাউন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, ইত্যাদি নানা কারণে অধিকাংশ মানুষের মাঝে এই বিষণ্ণতা দেখা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় বিষণ্ণতার ওষুধ সেবনের জন্য অসুস্থদের উৎসাহিত করতে হবে। এর পাশাপাশি বিষণ্ণদের উৎসাহ-জনক গান শুনানো, নিরাশ না হওয়া বলা- মানে মনোবল ঠিক রাখা, যথাসম্ভব সুষম খাবার খাওয়া এবং সঠিক ভাবে ঘুমানো, নিজের বাচ্চা এবং পোষদের নিয়ে সময় কাটানো, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা, মূল্যহীন এবং নেগেটিভ চিন্তা ভাবনা থেকে নিজেকে দূরে রাখা, ইত্যাদি।
করোনা মহামারীর কারণে সারা দেশে ডাক্তার ও সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষেরা দৈনিক ১৮/২০ ঘণ্টা ডিউটি করছেন। ডাক্তারগণ, জুনিয়রগন আরও বেশী ডিউটি করছেন। তারা তাঁদের বাবা-মা আত্মীয় পরিজন ভাই বোনদের সাথে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে পারছেন না, মনের কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে তাঁদের ভিতর একধরণর বিষণ্ণতা কাজ করছে। তাই তাঁদের সহকর্মীদের চাংগা করতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৩ জন ডাক্তার নিজেদের সহকর্মী ও রোগীদের বিষণ্ণতা তথা মনোবল বাড়িয়ে রগ মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগাতে নেচে নেচে গান করেছেন। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এটা নিয়ে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করেছে। তা কতোখানি ঠিক!
এর আগে কেরালার দুই জন মেডিক্যাল স্টুডেন্টের নাচ ভাইরাল হয়েছিলো। তা নিয়েও হয়েছিল হৈ চৈ।সদ্য প্রয়াত ভারতের লিজেন্ড অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অভিনীত এক ছবিতে অধ্যাপক অম্বরিশ রায় হিসেবে তাঁর এক ডাক্তার ছাত্রকে বলেন, ‘অর্ধেক রোগ মনে মনে’। এই ভিডিও ক্লিপটি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছিলো।ভারতের আরেকটি জনপ্রিয় সিনেমা হচ্ছে, মুন্না ভাই এমবিবিএস। সেখানে খুব চমৎকার করে বিষণ্ণতা থেকে রোগীদের বের করে এনে কিভাবে সুস্থ করা যায় তা দেখানো হয়েছে।
আর একটি বাস্তব গল্প জেনেছি জাইকার একজন কর্মকর্তার কাছে। সেটা ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে বিএনপি ক্ষমতায় সার সময়, যখন শিশু হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার (অব:) মকসুল হোসেন চৌধুরী। তখন শিশু হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন জাপানিজ টেকনিশিয়ানরা, নার্সও ছিলেন জাপানিজ। একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করা গেল যে, কছু ছোট ছোট শিশু শরীরে কোন রোগের লক্ষণ নেই কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরতে পারছে না।
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট সহ বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করা জাপানিজ ডাক্তারদের সাথে আলাপ করে শিশু হাসপাতালের জাপানিজ নার্সরা জাপানিজ টেকনিশিয়ানদের (সবাই বাংলা পড়তে ও বলতে পারেন) নিয়ে একটা দম ফাটানো হাসির নাটক লিখলেন। নাটকের নাম ‘কাঁঠাল রাজা’। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ১৫ দিন ধরে মহড়া শেষে বিকেলে দিকে হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে কয়েক দফা অসুস্থ শিশদের সামনে শিশু হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে নাটক মঞ্চস্থ করা হল। নাটকে যারা অভিনয় করলেন তারা সবাই জাপানিজ। কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল উপসর্গ-হীন সব অসুস্থ শিশুরা আস্তে আস্তে সুস্থ হয় হাসপাতাল ছেড়ে গেল। আসলে ঐ সব শিশুরা বিষণ্ণতায় ভুগছিল বলে মনে করা হয়েছিলো, তাই এই মানসিক ওষুধ।













































