ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-অভিযান ও সমর্থক মহলে উত্তেজনা। সোশাল মিডিয়াসহ নানা ধরনের প্রচার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বক্তব্য, ওয়াদা, পরিকল্পনা ও নানা বিষয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্যও উঠে আসছে ব্যাপক মাত্রায়। আগামী ১৮ জুন শুক্রবার দেশটিতে ১৩ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক ইস্যু সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী এবারের এই নির্বাচনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রায়িসি। একজন বড় আলেম ও বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি জনকল্যাণমূলক অনেক তৎপরতার রেকর্ডের কারণে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তার এইসব তৎপরতার মধ্যে রয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া নানা কল-কারখানা পুনরায় খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা এবং দুর্নীতি বিরোধী নানা পদক্ষেপ।
হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রায়িসি
বিচার বিভাগের সাবেক প্রধান জনাব রায়িসি গত রোববার বলেছেন, উৎপাদন, বিয়ে ও গৃহায়ন খাতে ব্যাংকিং বিভাগের নানা সুবিধা যথাযথভাবে বণ্টন করা উচিত। দরিদ্র শ্রেণীর জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা রাখা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। গৃহিণীসহ নানা শ্রেণীর জনগণ যাতে ইন্টারনেট ব্যবহার করে আয় করতে পারেন তার সরকার সেই ব্যবস্থা করবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
রায়িসি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও তার পেছনে রক্ষণশীল বা প্রিন্সিপালিস্ট শিবিরের সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়। রায়িসি ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েও ডক্টর হাসান রুহানির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। গত শুক্রবার থেকে ইরানে ১৩ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
ড. সাঈদ জালিলি
এদিকে রক্ষণশীল শিবিরের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রার্থী ড. সাঈদ জালিলি গতকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে বলেছেন, যারা সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধের ইরানি কমান্ডার কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করেছে তাদের কাছ থেকে অনুগ্রহের জন্য ইরানের অপেক্ষা করা উচিত নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের (২০২০) জানুয়ারি মাসে সুলাইমানিকে ইরাকে শহীদ করে।
তিনি আরও বলেছেন, আমরা মনে করি কোনো দুর্বল নীতি ও দুর্বল ভূমিকা রেখে দেশকে উন্নতির শীর্ষে নেয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেছেন, পরমাণু বিষয়ে ইরানি আলোচক টিমের সাবেক প্রধান হিসেবে তিনি নীতিগতভাবে আলোচনার বিরোধী নন, তবে সব ডিমই একই ঝুড়িতে রাখা উচিত নয় ! জালিলি বলেন, এটা বলা ঠিক নয় যে আমরা ছাড় দিয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি আদায় করেছি যে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের গ্যারান্টিযুক্ত নয়। সরকারের উচিত ইরানের সব সক্ষমতাগুলোকে সক্রিয় করা। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর বেশি জোর দেয়ার দাবি জানিয়ে সাঈদ জালিলি বলেছেন, এই প্রদেশের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো হলে কেবল স্থানীয়রা নয় গোটা দেশ উপকৃত হবে।
মোহসেন রেজায়ি
রক্ষণশীল শিবিরের আরও এক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মোহসেন রেজায়ি তার সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ‘আঞ্চলিক কূটনীতির অংশ’ হিসেবে ২৫ দেশের ‘দক্ষিণ-পশ্চিম-এশিয়ার জোট’ গঠনের কথা বলেছেন এবং দুই সন্তানের অধিকারী গৃহিণীদের জন্য সন্তান প্রতিপালন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ ও মাসোহারার ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়াও নির্বাচিত হলে তিনি দেশের চার কোটি নাগরিকের জন্য প্রচলিত ভর্তুকির অর্থের পরিমাণ ৪৫ হাজার তুমান থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার লাখ তুমান করবেন বলেও জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক কোনো কোনো বিষয়ে তিনি প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেবেন বলেও জানিয়েছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক প্রধান মোহসেন রেজায়ি মনে করেন তার প্রস্তাবিত ২৫ দেশের ‘দক্ষিণ-পশ্চিম-এশিয়ার জোট’ ইউরোপীয় জোটের মতই শক্তিশালী হবে। এইসব দেশ ১২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় করে থাকে বলে তিনি জানান।
সাইয়্যেদ কাজিজাদেহ হাশেমি
রক্ষণশীল শিবিরের আরও এক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সাইয়্যেদ কাজিজাদেহ হাশেমি বলেছেন, তার দেশের অর্থনীতিতে স্বর্ণ ও বৈদেশিক বিনিময়ের চেকসহ নানা ধরনের বিকল্প, সাংকেতিক বা উপ-মুদ্রা ব্যবহার করা উচিত নগদ অর্থ বা মুদ্রা নয়। তার সরকার প্রত্যেক ইরানির জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে বলে তিনি জানান। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি জনগণের স্বাস্থ্যের দিকেও লক্ষ্য রাখবেন বলে জানান। জনগণকে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সরবরাহ করতে তিনি প্রতি মাসে প্রত্যেক ইরানিকে তিন লাখ তুমান (প্রায় ৭২ ডলার) দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন বলেও জানান।
ইরানের এক ফোটা তেলও বিক্রি করা উচিত নয় বলে হাশেমি মন্তব্য করেন।
মোহসেন মেহের আলীজাদেহ
এবারের নির্বাচনে সংস্কারপন্থী শিবিরের অন্যতম প্রার্থী মোহসেন মেহের আলীজাদেহ বলেছেন, উৎপাদনের মত রপ্তানিকেও সমান গুরুত্ব দেয়া উচিত। দেশের নিম্ন-আয়ের ৫ শ্রেণীর নাগরিকের জন্য তিনি সরকারি ভর্তুকির অর্থ ৫ গুণ বাড়াবেন বলে জানিয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে সংস্কারপন্থী শিবিরের আরেক প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান আব্দুন নাসের হেম্মাতি বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে তার সরকার বাইরের (দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে) নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অন্তত ৫ শতাংশ অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং মুদ্রাস্ফীতি আট থেকে বারো শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারবে। রপ্তানিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা নন-অয়েল রপ্তানি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারব। তিনি দুর্নীতির ভিত্তিগুলো দূর করার ওপর জোর দেন। তিনি করখাতকে সবল করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বের দেশগুলোতে করের মাধ্যমেই ভর্তুকি দেয়া হয়।
হেম্মাতি ইরানের ওপর বিদেশি নিষেধাজ্ঞাগুলোকে তার দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করে গত রোববার বলেছেন, দেশের ৫০ শতাংশেরও বেশি অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ হচ্ছে এইসব নিষেধাজ্ঞা যা হঠাৎ করে দেশের বৈদেশিক আয়কে আগের অবস্থা থেকে এক ষষ্ঠাংশ কমিয়ে দিয়েছে। তাই এটা স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হচ্ছে। যারা একে অস্বীকার করছেন তারা ভুল করছেন।
হেম্মাতি অর্থনৈতিক কোনো কোনো খাতে সরকারের হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন এ ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা উচিত এবং সরকারের উচিত অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা। অর্থনৈতিক বিষয়ে জনাব হেম্মাতির প্রশিক্ষণ রয়েছে।
এদিকে রক্ষণশীল শিবির থেকে দাঁড়ানো অন্যতম প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আলী রেজা যাকানি তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্কারপন্থী আব্দুন নাসের হেম্মাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি যুব সমাজের বেকারত্ব ও সুবিধা-বঞ্চিত শ্রেণীগুলোর অর্থনৈতিক সংকট দূর করার ওপর জোর দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে করেন তার দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর বেশিরভাগই বাইরের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং দেশের ভেতরেই এসবের সমাধান রয়েছে। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/১













































