‘তার নিকট থেকে প্রাপ্ত অধিকাংশ কাগজই বাংলাদেশের সাথে দুটি বিদেশী রাষ্ট্রের নিকট হতে করো’না ভ্যাকসিন ক্রয় চুক্তি সংক্রান্ত। যা প্রকাশিত হলে বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স’ম্পর্কের অবনতি এমন কি দ্বিপাক্ষিক টিকা ক্রয় প্রক্রিয়াও বিঘ্নিত যাওয়ার আশ’ঙ্কা ছিল। যার ফলে দেশবাসি টিকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারত এবং করো’না নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাজও বিঘ্নিত হত।’
জনগণের অর্থ ব্যয় করে পত্রিকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিজ্ঞাপনের কিছু অংশ। সাংবাদিক রোজিনা এই চুক্তি ‘চু’রি’ করেছিলেন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই বলছে। তাড়াহুড়ো করে হয়ত ‘বিঘ্নিত যাওয়ার’ লিখেছে ‘হওয়ার’ পরিবর্তে!
তল্লা’শি করে রোজিনার শরীরের ‘বিভিন্ন’ স্থানে লুকিয়ে রাখা ৬২ পৃষ্ঠার ‘চুক্তি-নথি’ পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রায় একই ভাষ্য গণমাধ্যমকে বলেছেন। সংবাদকর্মীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘অফিস সহকারী মাকসুদা সুলতানা পলি গলা টিপে ধরছেন সাংবাদিক রোজিনার, এই ভিডিওচিত্র বিষয়ে তার বক্তব্য কী’? তিনি বলেছেন, ‘রোজিনাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়নি। রোজিনা অ’তিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসাকে খামচি দিয়েছেন, থাপ্পড় দিয়েছেন।’
এ কথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী শুনেছেন অ’তিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসার থেকে।
মা’মলা প্রসঙ্গে আসি। মা’মলার এজাহারে ‘প্রকাশ করা যাবে না’ এমন রাষ্ট্রীয় চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে পু’লিশের করা ‘জ’ব্দ তালিকা’ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে।
পু’লিশের জ’ব্দ তালিকায় আছে জেনেভায় নিযু’ক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দুই পৃষ্ঠার একটি চাহিদাপত্র। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারের পরিচালকের পাঠানো ৫৬ পৃষ্ঠার চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের একটি প্রস্তাবনা। মন্ত্রিসভা’র জন্যে তৈরি করা দুই পৃষ্ঠার একটি ক্রয় সংক্রান্ত প্রস্তাবনা। করো’না টিকা বিষয়ে পরাম’র্শক কমিটির পরাম’র্শের দুই পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ। এ ছাড়া, জ’ব্দ তালিকায় আছে দুটি মোবাইল ফোন ও আইডি কার্ড।
এই জ’ব্দ তালিকায় মোট কাগজপত্র ৬২ পৃষ্ঠা ঠিক আছে। কিন্তু ‘দুটি দেশের থেকে করো’না টিকা ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি’র নথির কোনো উল্লেখ নেই।
তার মানে জ’ব্দ তালিকার কোনোটিই ‘রাষ্ট্রীয় অ’প্রকাশযোগ্য’ চুক্তি নয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, পু’লিশ এসব কাগজপত্র জ’ব্দ করেছে অ’তিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসার কাছ থেকে, রোজিনার থেকে নয়। পু’লিশ জ’ব্দ তালিকায় এ কথা লিখেছে।
তল্লা’শি বা জ’ব্দ কে করবেন বা করতে পারেন, প্রক্রিয়া কী’? এ বিষয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছিলেন, ‘অ’তিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা জ’ব্দ তালিকা করতে পারতেন। তবে তাকে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। স্থানীয় দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, যারা হবেন নিরপেক্ষ, এমন দুজনের উপস্থিতিতে তল্লা’শি করে পাওয়া নমুনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। নথি পকে’টে পাওয়া গেছে লিখলে হবে না। কোন পকে’টে, বাম পকে’টে না ডান পকে’টে সুনির্দিষ্ট করে লিখতে হবে। বাম কোম’রে না ডান কোম’রে, পেছনে না সামনে সবকিছু লিখতে হবে।’
মা’মলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে রোজিনা সচিবের একান্ত সচিবের রুমে ঢুকেছেন। তারপর পু’লিশ কনস্টেবল তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছিলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছে ৩টার দিকে। জ’ব্দ তালিকা হওয়ার কথা তখনই। কিন্তু জ’ব্দ তালিকা হয়েছে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। আইন অনুযায়ী যার কোনো সুযোগ নেই। পু’লিশ কাগজপত্র জ’ব্দ করেছে অ’তিরিক্ত সচিব জেবুন্নেসার কাছ থেকে, সাংবাদিক রোজিনার থেকে নয়। ফলে জ’ব্দ তালিকা রোজিনার বি’রুদ্ধে মা’মলায় ব্যবহারের সুযোগ নেই।’
এবার আসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গুটিকয়েক লোকের কারণে আম’রা প্রশ্নের মুখে পড়ছি। আমাদের লুকিয়ে রাখার কিছু নেই, আন্তর্জাতিকভাবেও আমাদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।’ (দ্য ডেইলি স্টার, ২০ মে ২০২১)
টিকা ক্রয়ে দেরি সংক্রান্ত বিষয়েও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট করে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আম’রা চীন ও রাশিয়া থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। চীনের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। চীন আমাদের কাছে তিনটি ডকুমেন্ট পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে আম’রা দুটি ডকুমেন্ট তাদের ফেরত পাঠিয়েছি। দুটির মধ্যে একটি কালকে ফেরত পাঠিয়েছি, যেখানে একটি অংশ ছিল ইংরেজিতে এবং আরেকটি ছিল চীনা ভাষায়। আম’রা (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) সই করে ফেরত পাঠানোর সময়ে চীনা ভাষার অংশে সই করেছি। এটা জানার পর চীনা ভাষার অ’ভিজ্ঞ একজন অধ্যাপককে নিয়োগ করে সেটি (ডকুমেন্ট) সংশোধন করা হয়েছে। দিস আর লাউজি ওয়ার্ক এবং এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু যোগাযোগ করিয়ে দেয়। অন্য সব বিষয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখে। সেখানে একটু দেরি হচ্ছে।’ (প্রথম আলো, ২০ মে ২০২১)
তাহলে বিষয়টি কী’ দাঁড়াল? টিকা কেনা সংক্রান্ত এত গুরুত্বপূর্ণ কাগজে সই করতে ভুল করলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অ’তি গুরুত্বপূর্ণ কর্মক’র্তারা? সই কোথায় করতে হবে, তা তারা বুঝলেন না? জানলেন না? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী এত ‘গো’পন’ চুক্তির কোথায় সই করতে হবে তা তারা বোঝেননি। ভুল জায়গায়, মানে ইংরেজি অংশের পরিবর্তে চীনা ভাষার অংশে সই করেছেন। তা সংশোধনের জন্যে আবার একজন চীনা ভাষা জানা অধ্যাপকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। ‘অ’তি গো’পনীয়’ চুক্তি একজন অধ্যাপক জেনে গেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভুল বা অদক্ষতার কারণে!
করো’না মহামা’রিকালেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে দক্ষতা, স্বচ্ছতা বা গতি বাড়েনি। বেইজিংয়ে নিযু’ক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হতাশ হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করছেন, লিখছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানাচ্ছেন, কিন্তু কাজের গতি বাড়ছে না। চীন থেকে টিকা কিনতে দেরি হচ্ছে। রাশিয়া ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি পাঠিয়েছে। সেটাও সংশোধন করতে বেশি সময় নিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রাশিয়া থেকে প্রথমে যে পরিমাণ টিকা কিনতে চেয়েছিল, পরে পরিমাণ কমানো হয়েছে। একবার বেশি আরেকবার কম পরিমাণ বলা পছন্দ করছে না রাশিয়া। এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, টিকা কিনতে দেরি হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভুলে ও অদক্ষতায়। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাংবাদিক রোজিনার ওপর দায় চাপিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছে ‘দেশবাসি টিকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারত এবং করো’না নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাজও বিঘ্নিত হত’।
সাংবাদিক রোজিনাকে ছয় ঘণ্টা আ’ট’কে রেখে হেনস্থা করার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নাম এসেছে অ’তিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা বেগমের। তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা রকমের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এ ধরণের সংবাদ যাতে প্রকাশিত না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে উপ-সচিব আনজুমান আরা গত ১৯ মে একটি চিঠি লিখেছেন তথ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে।
চিঠিতে লিখেছেন, ‘…রাষ্ট্রের একজন কর্মক’র্তা এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে এতে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনের ম’র্যাদাহানি হচ্ছে। অনতিবিলম্বে বিষয়টি সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে কাজী জেবুন্নেছা বেগম, অ’তিরিক্ত সচিব স’ম্পর্কে অসত্য, সংবাদ, ছবি বা ভিডিও ক্লিপ প্রচার করা থেকে বিরত রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ ব্রিটিশদের করা আইনের মতো ভাষারীতিতে সরকারি কর্মচারীরা এখনো সেখানেই রয়ে গেছেন!
যাই হোক প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ একজন সরকারি কর্মক’র্তা, একজন নারী কাজী জেবুন্নেসাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকও বলেছে ‘সুনির্দিষ্ট’ অ’ভিযোগ পেলে ত’দন্ত করা হবে। বোঝা যায় সামাজিকভাবে তার সম্মানহানি হচ্ছে। কোনোভাবেই আম’রা সম্মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের পক্ষে নই। বিশেষ করে যদি তা তথ্য প্রমাণভিত্তিক না হয়। এ ধরণের সংবাদ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। বিনয়ের সঙ্গে কাজী জেবুন্নেসাকে উপলব্ধি করতে অনুরোধ করি, সাংবাদিক রোজিনার বিষয়টি। কোনো প্রমাণ ছাড়া ‘তথ্য চো’র’ আখ্যা দিয়ে আপনারা তার নামে মা’মলা করেছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাকে ‘চো’র’ বলেছেন। আপনার সম্মানহানি হয়, সম্মানহানি রোজিনার হয় না? অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা আপনাদের মন্ত্রণালয়ের শত শত কোটি টাকা দু’র্নীতির সংবাদ প্রকাশ করেছেন। নিয়োগে এক কোটি টাকা ঘুষ প্রস্তাবের সংবাদ প্রকাশ করেছেন। এই সংবাদগুলো দেশ ও দেশের মানুষের উপকারে এসেছে। সমস্যা হয়েছে দু’র্নীতি সংশ্লিষ্টদের। অ’তি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এক বছর ধরে বিমানবন্দর ফেলে রেখেছিলেন। রোজিনার রিপোর্টের পর তা তিন দিনে ছাড়াতে পেরেছেন। জনগণের উপকার হয়েছে। এসব সংবাদের তথ্য-প্রমাণ রোজিনাকে নানা কৌশলে সংগ্রহ করতে হয়েছে। আপনারা এগিয়ে এসে দু’র্নীতির তথ্য-প্রমাণ রোজিনাকে সরবরাহ করেননি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকের তথ্য সংগ্রহের কৌশলকে তারাই ‘চু’রি’ বলেন, যারা সম্পৃক্ত চু’রি-দু’র্নীতির সঙ্গে।
আপনাদেরকে কেন্দ্র করে যতগুলো ভিডিও ক্লিপিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তার সবকটি কিন্তু আপনাদের দপ্তরে করা। সরাসরি আপনি হয়ত করেননি। আপনার অফিসের লোকজন করেছে। আপনাদের অফিস সহকারী রোজিনার গলা টিপে ধরেছে। আপনি নিবৃত করেননি। আপনার সম্মতিতে বা জানা মতেই হয়ত সবকিছু হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, সিসি টিভি ফুটেজের এবং ছয় ঘণ্টা বেআইনিভাবে আ’ট’কে রেখে করা অ’নৈতিক ভিডিও ফুটেজের আংশিক ছড়িয়ে দিয়ে সাংবাদিক রোজিনার চরিত্রহননের প্রচেষ্টা চলছেই। কারা ছড়াচ্ছেন এই ফুটেজ? এসব তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আপনাদের তত্ত্বাবধানেই আছে। আপনাদের বি’রুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ বন্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কারাগারে ব’ন্দি রোজিনা ইস’লামের সংবাদ বি’কৃতভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। অথচ দাবি করেন আপনারা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্মচারি!













































