প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

হুইপপুত্র শারুন মুনিয়াকে ব্লাকমেইলে ব্যবহার করতে ছিলেন মরিয়া

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

রাজধানীর গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে ম’রদেহ উ’দ্ধার হওয়া মোসারাত জাহান মুনিয়া (২১) স’ম্পর্কে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। খোদ তার বড় বোন ও গুলশান থা’নায় করা মা’মলার বাদী নুসরাত জাহান বলেছেন, ‘ছবি নিয়ে মুনিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছিল হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছে’লে নাজমুল হক চৌধুরী শারুন।’ নুসরাত আরও বলেন, ‘মুনিয়া তার বিপদ থেকে উ’দ্ধার হওয়ার জন্য শারুনের সহযোগিতা চেয়েছিল।

শারুন তাকে (মুনিয়া) বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করে।’ তবে শারুন এসব অ’ভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। এদিকে শারুন-মুনিয়ার স’ম্পর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন তার সাবেক স্ত্রী’ সাইফা রহমান মীম। তিনি বলেন, ‘শারুনের শারীরিক-মানসিক নি’র্যাতনের কারণে আমি কয়েক দফা সুই’সাইড করার চেষ্টা করি। মোসারাত জাহান মুনিয়াসহ বহু নারীর সঙ্গে শারুনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। মুনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে কথা বললে সে আমাকে বেধড়ক মা’রধর করে। এমনকি আমি ও আমা’র মা-বাবাকে হ’ত্যার হু’মকি দেয়। তার সঙ্গে সবসময় পি’স্তল থাকে, ওই পি’স্তল উঁচিয়ে ভ’য় দেখায়।’

গত ২৬ এপ্রিল গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার ম’রদেহ উ’দ্ধার করে পু’লিশ। এরই মধ্যে তার বিষয়ে বহু তথ্য এসেছে পু’লিশের হাতে। পু’লিশ প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে এসব ঘটনার সঙ্গে মুনিয়ার আত্মহ’ত্যার সংযোগ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

মুনিয়ার সঙ্গে শারুনের স’ম্পর্ক কী’ ছিল, পরিচয় কী’ভাবে- জানতে চাইলে তার বড় বোন নুসরাত জাহান বলেন, ‘মুনিয়ার সঙ্গে শারুনের পরিচয় ছিল। সেটা আমি জানতাম। মুনিয়া আমাকে বলেছে, শারুন একটি ছবি নিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা কী’ ছবি এটা আমি জানি না। তাছাড়া শারুনের স্ত্রী’ সাইফা রহমান মীমকেও আমি চিনতাম।’

শারুনের সঙ্গে মুনিয়ার চ্যাটিংয়ের কয়েকটি স্ক্রিনশট গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে। এতে লেখা ছিল, ‘তারা আমা’র নামে নিউজ করতেছে, কী’ করতে পারছে। সো টাইম নাই, ইফতারির টাইম হয়ে যাচ্ছে, আমাকে টেলিগ্রামে নক দিও।’ জবাবে মুনিয়া লেখেন, ‘আপনি আসলেই ফেরেশতা, কেন যে আপনার মতো মানুষ আমি পাইনি লাইফে।’

এছাড়া মুনিয়ার টাকা চাওয়ার কয়েকটি চ্যাটের স্ক্রিনশট পাওয়া গেছে। তবে ওই চ্যাটগুলো কার সঙ্গে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এতে লেখা, ‘খুব বিপদে আছি, আমা’র টাকা দরকার। হাতে টাকা নাই। বড় লোক একটা ধরতে হবে আবার। তুমি অনেক মজা নিছ আমা’র সাথে, এখন বলছ নাই, মনে আছে সেই দিনের কথা, কত আদর করছ আমাকে, কত মজা নিছ, আর আমাকে এখন টাকা দিচ্ছ না, বাসা ভাড়া নাই, বড় আপুকে টাকা দিতে হবে। আবার এমন কাউকে ঠিক করতে হবে যাকে ব্ল্যাকমেইল করে অনেক কিছু নেওয়া যায়, যে সম্মানের ভ’য় পায়, সম্রাট জে’লে যাওয়ার পর খুব বিপদে আছি। আপু-ভাইয়া (ভগ্নিপতি) ঝগড়া করে টাকার জন্য। সবই তো জানো। আমি একা মানুষ, কত করা যায়, টাকা না দিলেই ঝগড়া।’

জবাবে মুনিয়াকে লেখা হয়, ‘তুমি এখন কোথায়।’ মুনিয়া লেখেন, ‘এক বড় ভাইয়ের বাসায়।’ এরপর মুনিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ‘কী’ করো?’ মুনিয়ার জবাব, ‘তুমি বুঝো না? প্লিজ (টাকা) রেডি করো।’ জবাবে লেখা হয়, ‘কী’ আজব, আমি কি এগুলো করি নাকি, আমি কোথা থেকে রেডি করব।’ এরপর মুনিয়া লেখেন, ‘ওকে তোমা’র বউকে সব বলব।’ এবার জবাবে আসে, ‘আবার শুরু করলা?’ মুনিয়া লেখেন, ‘না হলে তুমি টাকা দাও। নুসরাত আপু আমাকে খুব জ্বালাচ্ছে। টাকা না দিলে মাইর খাব। ভাইয়ারও (ভগ্নিপতি) বিপদ যাচ্ছে। টাকা’টা লাগবে। দাও। আমা’র এই নম্বরে কিছু টাকা দাও। পার্সোনাল নম্বর। ৩০ মিনিটের মধ্যে দাও।’ জবাবে লেখা হয়, ‘কী’ভাবে, আমি বাসায়।’ মুনিয়া লেখেন, ‘জানি না লাগবে আমা’র। না হলে বউকে ফোন করে…।’ জবাবে ওই ব্যক্তি লেখেন, ‘মানুষকে এত ক’ষ্ট দিও না, নিজে একদিন বিপদে পড়ে যাবে, এত ব্ল্যাকমেইল ভালো না। দিচ্ছি।’ এরপর মুনিয়া লেখেন, ‘ওকে, দাও পরে দেখছি। আমা’র কেউ কিছু করতে পারবে না।’

এ চ্যাটের স্ক্রিনশটের বিষয়ে পু’লিশের কোনো কর্মক’র্তাও কিছু জানাতে পারেননি। যে নম্বরে মুনিয়া চ্যাট করেন ওই নম্বরটি শুক্রবার সন্ধ্যায়ও খোলা ছিল। সেখানে কয়েকবার কল দেওয়া হলেও কেউ রিসিভ করেনি। ট্রু কলারে ওই নম্বরের আইডি আসে ‘নুসরাত জাহান’।

এদিকে মুনিয়ার সঙ্গে শারুনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তার সাবেক স্ত্রী’ সাইফা রহমান মীম বলেন, ‘শারুনের সঙ্গে মুনিয়ার ঘনিষ্ঠ স’ম্পর্ক ছিল। আমি সেটা জানতাম। মুনিয়ার বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে সে আমাকে বেধড়ক মা’রধর করে। এমনকি আমা’র মে’য়ে সাইশা করিম চৌধুরীকে মা’রার হু’মকিও দেয়। একপর্যায়ে আমি সুই’সাইড করারও চেষ্টা করি।’

মীম আরও জানান, ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর শারুনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরের বছর ২৪ জুন তাদের একমাত্র মে’য়ে সাইশা করিম চৌধুরীর জন্ম হয়। মীমের দাবি, এরপর থেকেই মানসিক ও শারীরিক নি’র্যাতনসহ, বিচ্ছেদে ঠেলে দেওয়া এবং একমাত্র শি’শুসন্তানকে আ’ট’কে রাখা, হ’ত্যার হু’মকি এবং আত্মহ’ত্যা করার মতো গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে শারুন।

সাইফা মীম বলেন, ‘সে (শারুন) আমাকে কথায় কথায় মা’রত। উঠতে-বসতে মা’রত। তার অনেক মে’য়ের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ ছিল। মুনিয়ার সঙ্গেও তার স’ম্পর্ক অনেক গভীর ছিল। আমি এসব বিষয় জেনে যাই। তার কাছে জানতে চাইলে সে আমাকে মা’রধর করত। আমা’র সঙ্গে বিভিন্নজনের নাম জড়িয়ে অনেক অ’পবাদ দিয়েছে। অনেক আজেবাজে কথা বলেছে। আমাকে নিয়ে অনেক নোংরা কথা বলেছে। আমা’র চেনা অনেকের সঙ্গেও আমাকে জড়িয়ে অ’পবাদ দিয়েছে। কাউকে চেনা মানেই তো পর’কী’য়া নয়।’

শারুনের সাবেক স্ত্রী’ আরও বলেন, ‘সে (শারুন) বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দিয়ে অনেক রাতে বাসায় ফিরত। কোথায় ছিল, এটা তো আমি স্ত্রী’ হিসেবে জানতে চাইতেই পারি। আমি প্রশ্ন করলেই আমাকে মা’রধর করত। তার সঙ্গে অনেক মে’য়ে এমনকি অনেকের স্ত্রী’রও স’ম্পর্ক ছিল। আমি নাম বলতে চাই না। আমি একজন স্ত্রী’ হিসেবে এসব লাইক করতাম না। মুনিয়ার সঙ্গে স’ম্পর্কের বিষয়টি আমি জেনেছি এবং দেখেছি। এটা নিয়ে প্রশ্ন করাতেও সে আমাকে মা’রধর করে। সে (শারুন) অনেকবার আমাকে মে’রে ফেলার চেষ্টা করে। বালিশচাপা দেয় অনেকবার। পরে আমি বাবার বাসায় চলে আসি এবং তাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিই।’

সাইফা মীম বলেন, ‘আমি ওই বাসায় (শারুনের বাসা) থাকতেই সুই’সাইড করার চেষ্টা করি। আমি হাসপাতা’লেও ছিলাম। শারুন আমা’র বাবাকে খুবই ইনসাল্ট করত। সে আমাকে মা’রধর করার পর আমি বাসায় এসে পড়লেও সে আমা’র আব্বু-আম্মুকে কথা বলতে বাধ্য করত। সে আমাকে ফোন দিয়ে বলত, “তোর বাপকে ফোন ধরতে বল নইলে তোকে আর তোর বাপকে সুই’সাইড করতে বাধ্য করব। আমা’র সামনেই সুই’সাইড করবি।” তাছাড়া তার সঙ্গে সারাক্ষণ একটা পি’স্তল থাকে। সে আমাকে নিয়ে ড্রাইভিংয়ে বেরিয়ে উল্টোপাল্টা গাড়ি চালিয়ে বলত, “তোরে আর তোর বাচ্চারে নিয়ে আমিসহ ম’রব।”’

শারুনকে ‘সাইকো’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে তারা আমা’র মে’য়েকে আ’ট’কে রেখেছে। সে আমাকে মে’য়ের সঙ্গেও কথা বলতে দেয় না।’

যু’ক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করা উচ্চশিক্ষিত নারী সাইফা মীমের গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। তিনি এখন মা-বাবার সঙ্গে রাজধানীর লালবাগ এলাকায় থাকেন। সাইফা মীম বলেন, ‘আমি তাকে (শারুন) ডিভোর্স দেওয়ার পরও সে আমাকে নানাভাবে প্রেসার দিচ্ছে। বলছে তুই আ’মেরিকা চলে যা। আমাকে মে’রে ফেলার থ্রেট দেয়। আমা’র বাবাকে মে’রে ফেলবে, বাচ্চাকে কিডন্যাপ করবে ইত্যাদি। আমি বাচ্চাকে ফোন দিলে আমা’র সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেয় না। বাচ্চাকে আমা’র দেওয়া আইপ্যাডটি পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছে। আমি আইনের দ্বারস্থ হব মে’য়ের অ’ভিভাবকত্ব চেয়ে।’

এছাড়া চলতি মাসের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের ব্যাংকার আকতার মোর্শেদ চৌধুরীর আত্মহ’ত্যার প্র’রোচনায় জ’ড়িতদের সহযোগী হিসেবে শারুনের নাম আসে। মোর্শেদের স্ত্রী’ শিক্ষিকা ইশরাত জাহান চৌধুরী মা’মলায় ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে করা সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ‘আমা’র স্বামীকে মানসিক নি’র্যাতন, হু’মকিসহ নানাভাবে আত্মহ’ত্যার পরিস্থিতি তৈরি করার পেছনে শারুনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

এদিকে সাইফা রহমান মীমের করা অ’ভিযোগ ও স্ক্রিনশটের বিষয়ে নাজমুল হক চৌধুরী শারুন বলেন, ‘আমা’র বি’রুদ্ধে আমা’র সাবেক স্ত্রী’ যা অ’ভিযোগ করেছে এসবই মিথ্যা বানোয়াট। আমি তাকে কখনই মা’রধর করিনি। রং ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করার কারণে তার চোখের ওপরে ব্রন জাতীয় গোটা ওঠে। সেটা দেখিয়ে সে আমা’র বি’রুদ্ধে অ’পপ্রচার করে বলেছে, মা’রধর করেছি।’

সাইফা মীমকে বিয়ে করাটা ছিল তার জীবনের বড় ভুল উল্লেখ করে শারুন বলেন, ‘আমি আ’মেরিকায় লেখাপড়া করতে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয়। সেখান থেকে পরিবারের অমতে বিয়ে করি।’

শারুন আরও বলেন, ‘যেসব স্ক্রিনশট দেখিয়ে আমা’র চ্যাটিং বলা হচ্ছে সেগুলো আমা’র নয়। আমি এর ফরেনসিক পরীক্ষা করার দাবি জানাই। তাছাড়া সেখানে বসুন্ধ’রা লেখা বানানটাও ভুল ছিল, আমি অন্তত এত অশিক্ষিত নই। তাছাড়া মুনিয়ার সঙ্গে আমা’র যে স’ম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো সবই ভু’য়া। সাইফার সঙ্গে দুই বছর আগেই আমা’র ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। সে কী’ভাবে জানল, মুনিয়ার সঙ্গে আমা’র স’ম্পর্ক ছিল। উল্টো যে শিল্পপতির ছে’লের কথা আপনারা বলছেন তার সঙ্গে সাইফার স’ম্পর্ক ছিল।’

মুনিয়ার বড় বোন নুসরাতের করা অ’ভিযোগের ব্যাপারে শারুন বলেন, ‘আমি ওই মহিলাকে চিনিই না। সে কী’ বলেছে তা-ও জানি না।’

এদিকে শারুনের সঙ্গে মুনিয়ার স’ম্পর্কের বিষয়ে মা’মলার তদারকি কর্মক’র্তা গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমা’র চক্রবর্তী বলেন, ‘আম’রা ত’দন্তে কিছু তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। আম’রা শারুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।’

সূত্র: দৈনিক দেশ রুপান্তর