প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা এখন কারাগারে। আগামীকাল তার জামিনের আবেদন সম্পর্কে আদেশ দেওয়ার কথা। রোজিনা জামিন পাবেন কি পাবেন না সেটি আদালতের এখতিয়ারাধীন বিষয়। কিন্তু রোজিনা ইস্যুটি ক্রমশ রাজনৈতিক অঙ্গনে ডালপালা মেলছে। আজকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন যে, রোজিনা ইস্যুতে অনেকে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। রোজিনা ইস্যুতে বাড়াবাড়ি করা নিয়ে সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। ১৭ মে থেকে আজ পর্যন্ত রোজিনা ইস্যুতে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রোজিনা ইস্যুতে আওয়ামী লীগের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধারা রয়েছে। এই ধারাগুলো হলো-
১. রোজিনা যা করেছে অন্যায়: আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করছে যে, রোজিনা যে কাজটি করেছে তা অন্যায়। রোজিনা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য চুরি করতে চেয়েছিল। এই তথ্য চুরির জন্য তার উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেঁটা করেছে সেটা ঠিকই আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ১৮ মে এনএসএ`র বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের যে বক্তব্য রেখেছেন তা থেকেই আওয়ামী লীগের এই অংশের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ রোজিনা অন্যায় করেছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলার টাকে চালিয়ে নেওয়া উচিত। এরকম মনোভাব প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেহেতু আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য। কাজেই এই মতামত আওয়ামী লীগের একটি অংশের মতামত। শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রী নয় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাই এই মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন। তাঁরা মনে করছেন যে, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপ সবসময় সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত এবং এই তথ্য চুরির ছিল সে ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এই ঘটনা দিয়ে তারা প্রথম আলো-ডেইলি স্টারকে একহাত দেখিয়ে নিতে চান।
২. রোজিনা অন্যায় করেছে, তবে তা মেটানো যেত: আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি দ্বিতীয় পক্ষ এবং যে পক্ষটি সবচেয়ে সিংহভাগ তারা মনে করেন যে, রোজিনা যে কাজটি করেছেন অন্যায় করেছে। অবশ্যই তিনি সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন বা নথির ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে রোজিনার সাথে যা করা হয়েছে তাতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমকে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এটি সংশ্লিষ্টরা না করলেও পারত। আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ রোজিনার ঘটনার পরপরই বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে, দুর্নীতির রিপোর্ট সংগ্রহকারীকে নয় বরং দুর্নীতিবাজকেই আইনের আওতায় আনা উচিত। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে যে, হানিফের মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন অনেকেই। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বাংলা ইনসাইডারকে বলেছেন যে, রোজিনার ইস্যুটি অন্যভাবে মোকাবেলা করা যেত। যদি রোজিনা সত্যি সত্যি অপরাধ করা থাকে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সচিবালয়ের পুলিশের হাতে সোপর্দ করলে ব্যাপারটা মিটে যেত। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল বলেছেন, একটি মহল গণমাধ্যমকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছে। সে জন্যই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
৩. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাড়াবাড়ি করেছে: আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করছে যে, রোজিনার ঘটনাটি অনভিপ্রেত এবং এই ঘটনা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাড়াবাড়ি করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রকাশ্যে বলেছেন যে, রোজিনার ইস্যুটি দুঃখজনক এবং সে অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে। তিনি বলেছেন যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। তার এই মতামতের সমর্থক সংখ্যাও কম নয়। আওয়ামী লীগের বহু নেতা ইনিয়ে-বিনিয়ে এই কথাটাই বলছেন যে, এই ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে তারা ষড়যন্ত্রকারী এবং এরাই সরকারকে ডুবাচ্ছে।
এই তিন ধারার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোন ধারা আওয়ামী লীগে শক্তিশালী হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।













































