প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

যে কারণে সিনেমায় এসেছিলেন হুমায়ূন ফরীদি

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র অ’ভিনয়ের সবখানে তিনি রাজত্ব করেছেন দুর্দান্ত প্রতাপে। কয়েক দশক অ’ভিনয়ে তিনি মাতিয়ে রেখেছিলেন নিজের অ’ভিনয় দিয়ে। ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’র সেরাজ তালুকদার,

‘সংশপ্তক’এর কানকা’টা রমজান কিংবা ‘শ্যামল ছায়া’র একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মানুষ মনে রাখবে অনেকদিন। নিজেকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছেন, তিনি হু’মায়ুন ফরীদি।আজ ২৯ মে, এ গুণী অ’ভিনেতার জন্ম’দিন। জন্ম’দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে জাগো নিউজ পরিবার স্ম’রণ করছে এই বরেণ্য অ’ভিনেতাকে।হু’মায়ুন ফরীদির অ’ভিনয়ের ক্যারিয়ারের শুরু ১৯৬৪ সালে কি’শোরগঞ্জে মহল্লার মঞ্চনাট’ক দিয়ে। সেটাই ছিলো তার প্রথম মঞ্চ নাট’ক।

মঞ্চ দিয়ে যাত্রা করা ফরীদি টিভি নাট’ক দিয়েই দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পান। হয়ে উঠেছিলেন তুমুল জনপ্রিয় একজন অ’ভিনেতা। সেই তিনি চলচ্চিত্রে এসে হৈ চৈ ফেলে দিলেন। মন্দ-ভালো নানা চরিত্রে তার বৈচিত্রময় অ’ভিনয় হাসিয়েছে দর্শককে, কাঁদিয়েছেও, ভ’য়ও ধরিয়েছে।ফরীদি তার ক্যারিয়ারে অনেক কালজয়ী চরিত্র ও সংলাপ উপহার দিয়েছেন। আবার মশলাদার কিছু বাণিজ্যিক সিনেমায় তিনি অ’ভিনয় করেছেন যা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। সেই কাজগুলোকে ফরীদিও এড়িয়ে যেতে চাইতেন। মনে করতেন এগুলো তার রুটি রুজির প্রয়োজনেই করা। শিল্প এখানে না খোঁজাই উত্তম।

সে প্রসঙ্গে একবার কতাসাহিত্যিক ইম’দাদুল হক মিলনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন মূলধারার সিনেমায় তার সম্পৃক্ততার বিস্তারিত।সেই সাক্ষাৎকারে হু’মায়ুন ফরীদি বলেছিলেন, ‘একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখলাম আমা’র পক্ষে চাকরি করাও সম্ভব না, ব্যবসা করাও সম্ভব না। আমি অ’ভিনয়টা মোটামুটি খা’রাপ করি না। এটাই আমি সবচেয়ে কম খা’রাপ পারি। আমি চিন্তা করলাম, এর উপর নির্ভর করে বাঁচতে পারি কি না দেখা যাক।

তখন চিন্তা করে দেখলাম টেলিভিশনে কাজ করলে আম’রা পেতাম ৪২০ টাকা বা ৪২৫ টাকা। সে দিয়ে তো সংসার চালানো সম্ভব না। একমাত্র যদি আমি ফিল্মে কাজ করি, তাহলে ওখানকার যে পারিশ্রমিক, সেটা দিয়ে সংসার চালানো যাবে। ওই উদ্দেশ্যে আমা’র ফিল্মে যাওয়া। ফিল্মে যে আমি খুব একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা শিল্পে সাধনা করতে গেছি, সেটা একবারেই ভুল।’

প্রসঙ্গত, দীর্ঘ কর্মময় বর্ণাঢ্য অ’ভিনয় জীবন ছিল হু’মায়ুন ফরীদির। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চে সমান দাপটের সঙ্গে অ’ভিনয় করেছেন তিনি। হু’মায়ুন ফরীদির জন্ম ১৯৫২ সালের ২৯ মে, ঢাকার নারিন্দায়। বাবা এ টি এম নুরুল ইস’লাম ছিলেন জুরি বোর্ডের কর্মক’র্তা। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে ফরিদীকে মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কি’শোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ অসংখ্য জে’লায় ঘুরতে হয়েছে। মা বেগম ফরিদা ইস’লাম গৃহিনী।

ছোটবেলায় ছন্নছাড়া স্বভাবের জন্য ফরীদিকে ‘পাগলা’, ‘সম্রাট’, ‘গৌতম’- এমন নানা নামে ডা’কা হতো। মাদারীপুর ইউনাইটেড ইস’লামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল পাস দিয়ে চাঁদপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হলেন। ১৯৭১ সালে গিয়েছিলেন মুক্তিযু’দ্ধে। নয় মাস যু’দ্ধের পরে লাল-সবুজের পতাকা হাতে ঢাকায় ফিরলেও ঢাকা ভা’র্সিটিতে ফেরেননি।

টানা পাঁচ বছর বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়ে শেষে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অনার্সে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যচর্চার পুরোধা ব্যক্তিত্ব নাট্যকার সেলিম আল দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজনেরও প্রধান সংগঠক ছিলেন ফরীদি। সেখানে ‘আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নামে একটি নাট’ক লিখে নির্দেশনা দেন এবং অ’ভিনয়ও করেন । ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হন। জড়িয়ে যান মঞ্চের সঙ্গে।

সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অ’ভিনয় করে ফরিদী মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কি’শোরগঞ্জে মহল্লার নাট’ক ‘এক কন্যার জনক’-এ অ’ভিনয় করেন ফরীদি।মঞ্চে তার সু-অ’ভিনীত নাট’কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শকুন্তলা’, ‘ফনিমনসা’, ‘কী’ত্তনখোলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’ প্রভৃতি। ১৯৯০ সালে স্ব-নির্দেশিত ‘ভূত’ দিয়ে শেষ হয় ফরীদির ঢাকা থিয়েটারের জীবন।

এরপর আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’ ফরিদীর অ’ভিনীত প্রথম টিভি নাট’ক। যারা দেখেছেন বিটিভি’র ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩) নাট’কে সেরাজ তালুকদারের কথা মনে আছে নিশ্চয়। সেলিম আল দীনের রচনা ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় এই নাট’কে ফরিদীকে দেখা যায় টুপি দাড়িওয়ালা শয়তানের এক জীবন্ত মূর্তি রূপে। ‘আরে আমি তো জমি কিনি না, পানি কিনি, পানি’ কিংবা ‘দুধ দিয়া খাইবা না পানি দিয়া খাইবা বাজান’-এই সংলাপগুলো এখনও মন ছুঁয়ে যায়। সেগুলো নাকি আশির দশকে ভীষণ জনপ্রিয় ছিল।

এরপর শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ (১৯৮৭-৮৮)-এ ‘কান কা’টা রমজান’ চরিত্রে-ফরীদির অনবদ্য অ’ভিনয় কেউ ভোলেনি। ভুলা কি যায়! অসম্ভব! ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখু’ন’ (১৯৮২), ‘বকুলপুর কতদূর’ (১৯৮৫)’, ‘মহুয়ার মন’ (১৯৮৬), ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’ (১৯৮৬) ‘একদিন হঠাৎ’ (১৯৮৬), ‘ও যাত্রা’ (১৯৮৬) ‘পাথর সময়’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’ (১৯৯৩), ‘চন্দ্রগ্রন্থ’ (২০০৬), ‘কাছের মানুষ’ (২০০৬), ‘কোথাও কেউ নাই’ (১৯৯০),

‘মোহনা’ (২০০৬), ‘ভবেরহাট’ (২০০৭), ‘জহুরা’,‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘শৃঙ্খল’ (২০১০), ‘প্রিয়জন নিবাস’ (২০১১), ‘অক্টোপাস’, ‘আরমান ভাই দি জেন্টেলম্যান’ (২০১১)-আরো আরো অনেক নাট’কে বিরামহীনভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য টিভি নাট’কগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখু’ন’ (১৯৮২), ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩), ‘ভবের হাট’ (২০০৭), ‘শৃঙ্খল’ (২০১০) ইত্যাদি নাট’কে তিনি ছিলেন অনবদ্য।

নব্বইয়ের গোড়া থেকেই হু’মায়ুন ফরীদির বড় পর্দার জীবন শুরু হয়। বাণিজ্যিক আর বিকল্প ধারা মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অ’ভিনয় করেছেন। এরমধ্যে প্রথম ছবি তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’। এরপর তার অ’ভিনীত সিনেমা’র মধ্যে ‘সন্ত্রাস’, ‘বীরপুরুষ’, ‘দিনমজুর’, ‘ল’ড়াকু’, ‘দহন,’ ‘বিশ্বপ্রে’মিক’, ‘কন্যাদান’ (১৯৯৫), ‘আঞ্জুমান’ (১৯৯৫), ‘দুর্জয়’ (১৯৯৬), ‘বিচার হবে’ (১৯৯৬),‘মায়ের অধিকার’ (১৯৯৬) ‘আনন্দ অশ্র’ (১৯৯৭),

‘শুধু তুমি’ (১৯৯৭), ‘পালাবি কোথায়’, ‘একাত্তুরের যীশু’, ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘মিথ্যার মৃ’ত্যু’. ‘বিদ্রোহ চারিদিকে, ‘ব্যাচেলর’ (২০০৪), ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), ‘রূপকথার গল্প’ (২০০৬), ‘আহা!’ (২০০৭), ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।নেগেটিভ, পজেটিভ অর্থাৎ নায়ক-খলনায়ক দু চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল, এক কথায় ভা’র্সেটাইল।২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফাগুন দিনের আ’গুনে বিষাদ ছড়িয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন অ’ভিনয়ের কিংবদন্তি পুরুষ হু’মায়ুন ফরীদি।