প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

সাধারণ অর্থে স্বতন্ত্র ব্যক্তি বা সমপ্রদায়ের নির্ভয়ে, কর্তৃপক্ষের প্রহরতা কিংবা নির্দেশনা গ্রহণে বাধ্য না থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে বাক স্বাধীনতা। যা অন্যের স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রাখে। বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা মানবধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসলামে বাক স্বাধীনতার সংজ্ঞা ভিন্ন। ইসলামী শাস্ত্র মতে, বাক স্বাধীনতা হলো- আল্লাহর সন্তুষ্টি জ্ঞাপনের লক্ষ্যে স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করত অন্যের মত প্রকাশকে ক্ষুণ্ন না করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি লক্ষ্যে নিজের মতো কাজ করাই ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতা। ইসলাম বলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে শয়তানের প্ররোচনায় কোনো কাজ বা কথা বললে তা বাক স্বাধীনতা না হয়ে একান্ত স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে গণ্য হবে। যা মানুষের জন্য কাম্য নয়। ইসলাম এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে পশুত্বের সাথে তুলনা করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ তার চিন্তা, আদর্শ, বিশ্বাস বেছে নেওয়ার ব্যাপারে স্বাধীন। এক্ষেত্রে কেউ তাকে জবরদস্তি করার অধিকার রাখে না। ইসলাম ভিন্নমতের অধিকারকেও স্বীকার করে।

মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। একমাত্র মানুষকেই কথা বলার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে একজন থেকে অন্যজনে পৃথক পৃথক রুচি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও শক্তি প্রদান করেছেন। আর এই সব কিছুকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সুস্থ সুন্দর রাষ্ট্র কিংবা সমাজ গঠনের জন্য তাগিদ দিয়েছেন। আর সেই লক্ষ্যে আল্লাহ মানুষকে বাক স্বাধীনতা দিয়েছেন। যাতে তারা তাদের নিজস্ব ইচ্ছামতো সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলাম বলে বাক স্বাধীনতা হচ্ছে সুন্দর, সত্য ও সঠিক কথা এবং সঠিক পথ সন্ধানের স্বাধীনতা। সত্য মতামত প্রকাশের এই স্বাধীনতা ও নির্ভীকতার আসল উৎসই হলো ইসলাম। সত্যের প্রভাব কখনো ব্যর্থ হয় না। সত্যের প্রভাব আর ব্যাপ্তি অন্যদের উপ্ত করে। ইসলামে বাক স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ তার সামগ্রিক জীবনে মুক্তি, সাম্য, ন্যায়নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়।

আমরা যদি ইসলামপূর্ব সমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করি, যেই সমাজে বাক স্বাধীনতার কোনো বালাই ছিল না। ইসলাম এমনি এক মুহূর্তে বাক স্বাধীনতাকে মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করে যখন পুরো পৃথিবী ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। পৃথিবীর সর্বত্রজুড়ে তখন দাসদাসী বিক্রয়ের উৎসব চলতো। রাজাই ছিল যেখানে সর্বস্ব ক্ষমতার অধিকারী। প্রজারা ছিল দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ। বাক স্বাধীনতা বলে কিছু আছে তখনকার মানুষের তা অজানাই ছিল। মানুষের এই দাসত্বের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে ইসলাম স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইসলামের কল্যাণে মানুষ অর্জন করেছিল বিশ্বাসের স্বাধীনতা, চিন্তার ও সমালোচনার স্বাধীনতা ও সর্বোপরি কথা বলার স্বাধীনতা। চিরকাল পৃথিবীর মানুষগুলো যা প্রত্যাশা করে আসছিল।

একবার হজরত উমর (রা) ভাষণ দিচ্ছিলেন, ‘যদি তোমরা আমার মধ্যে বক্রতা দেখতে পাও আমাকে সোজা করে দিও।’ ঠিক সেই মুহূর্তে সমবেত লোকদের মধ্যে একজন বলে উঠল, ‘তোমার মধ্যে কোনো বক্রতা দেখলে আমরা তোমাকে তীক্ষ্ন তরবারি দিয়ে সোজা করে দেব।’ বাক স্বাধীনতার এমন দৃষ্টান্ত বর্তমান সমাজে বিরল। একদা গনিমতের মাল থেকে উমর (রা.) ও তার ছেলে কাপড় পেয়েছেন। খলিফার জামার প্রয়োজনে ছেলের কাপড়সহ নিজের জন্য একটি জামা বানান। ওই জামা গায়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন মঞ্চে। সেই মুহূর্তে উপস্থিত লোকদের মধ্যকার একজন বলেই ফেললো, ‘আপনি এক টুকরা কাপড় দিয়ে জামা কীভাবে বানালেন? যেখানে আমরা জামা  তৈরি করতে পারি নি?’ আনাস বিন মালেক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কোথাও যাচ্ছিলাম। রাসুলের গায়ে একখানা গাঢ়পাড়যুক্ত নাজরানি চাদর ছিল। এক বেদুইন হঠাৎ তার চাদর ধরে সাজোরে টান দিয়ে বলে, হে মোহাম্মদ! তোমার কাছে আল্লাহর দেওয়া যে সম্পদ আছে, তা থেকে আমাকে দেওয়ার আদেশ করো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন এবং তাকে কিছু দান করার আদেশ দিলেন। এটাই ছিল ইসলামী শাসনামলের বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অন্যতম দৃষ্টান্ত। সামপ্রতিককালে যা বিরল বটে। ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতার যে বিবেক প্রজ্জ্বলিত করেছিল অন্ধকার যুগেও তা অনির্বাণ ছিল।

বর্তমানে অনেকেই বাক স্বাধীনতাকে বাক সন্ত্রাসরূপে ব্যবহার করছে। বাক স্বাধীনতার নামে কারো বিশ্বাসকে কটূক্তি করা। মুক্তমনা নামে কারো ধর্মকে হস্তক্ষেপ করা। ব্যক্তিবিশেষ নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা। ইন্টারনেটের এই যুগে অনেকে কোনো কিছু চিন্তা না করে নিজের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব নিয়ে ভার্চুয়াল জগতে অনেক মতামত উপস্থাপন করে থাকে। যা অনেকের অনূভুতিতে আঘাত করে। ফলে বেঁধে যায় সংঘাত। সামপ্রতিককালে ইন্টারনেটে এই ধরনের অশ্লীল কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা পরিলিক্ষত হয়। এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দরুন মানুষ উগ্র ও সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। যা মোটেও কাম্য নয়। ইসলাম এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে কখনো প্রশ্রয় দেয় না। তাই তো ইসলামে বাক স্বাধীনতার একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি করে দিয়েছে। যাতে মানুষ বিভ্রান্ত ও অন্যদের ক্ষতিসাধন কিংবা সামাজিক অধঃপতন না ঘটে এবং অন্যদের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণ না করে। পবিত্র কোরআনের সুরা জাসিয়ার ১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে সৎকাজ করছে সে তার কল্যাণার্থেই করছে। আর যে অসৎকাজ করছে তাও তার ওপরই বর্তাবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।’

বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে সংবিধানের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, (১) ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এবং (২) ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দান করা হইল। সর্বোপরি বিবেকের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়াই সকলের কর্তব্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, ভাষাবিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়