ফাও দ্বীপের ভৌগোলিক দুর্গম অবস্থানের কারণে ইরাকি বাহিনী কখনো ভাবতেই পারেনি যে, সেখানে ইরান সামরিক অভিযান চালাতে পারে।
ওয়ালফাজর-৮ অভিযানের পর পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, ইরাকের সেনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্যাটেলাইট ও বিমান থেকে তোলা ছবি ও ইরানি যোদ্ধাদের সামরিক তৎপরতা দেখে এই রিপোর্ট দিয়েছিল যে, ইরান ফাও দ্বীপে হামলা চালাতে পারে। কিন্তু ইরাকের কেন্দ্রীয় সেনা কমান্ড সামরিক কৌশল পর্যালোচনা এবং খরস্রোতা আরভান্দ নদীর কথা বিবেচনা করে এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এ ধরনের অভিযান হবে ইরানের জন্য মস্ত বড় ভুল ও আত্মহত্যার শামিল।
ওয়ালফাজর-৮ অভিযানের কয়েকদিন আগে ইরাকি বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডার ফাও অঞ্চল পরিদর্শন করেন। তারা ইরানের যুদ্ধ প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করা সত্ত্বেও আরভান্দ নদীকে রক্ষাকবচ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, এই নদী পার হওয়ার জন্য ইরানকে এই নদীর ওপর স্বল্প সময়ে কয়েকটি সেতু নির্মাণ করতে হবে যা সম্পূর্ণ অসম্ভব। ইরাকি কমান্ডাররা এই অঞ্চলে ইরানের পক্ষে হামলা চালানো সম্ভব হবে না বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানের পরিস্থিতি সম্পর্কে ইরাকি বাহিনী সঠিক উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়া এবং এমন জটিল অভিযানের জন্য ইরানের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কারণে এ অভিযান চালানো সম্ভব হয়।
ইরানি যোদ্ধারা অভিযান শুরু করার পরবর্তী কয়েকদিন ইরাকিরা ভাবতে থাকে, ইরান হয়তো ‘হোর’ ও ‘মাজনুন’ দ্বীপে মূল অভিযান চালাচ্ছে এবং ‘ফাও’ দ্বীপে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা তাদের লোক দেখানো কৌশল; তারা ফাও দ্বীপ দখল করতে আসেনি। ইরাকি বাহিনীকে এভাবে ভুলের মধ্যে রাখার লক্ষ্যে ইরানের বিমান বাহিনী অভিযান শুরু হওয়ার তিন দিন পর্যন্ত হোর ও মাজনুন দ্বীপে কৌশলগত হামলা চালিয়ে যায়। ফাও অভিযান শেষ হওয়ার পর ইরাকের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারিক আজিজ বলেছিলেন, আমেরিকা স্যাটেলাইট থেকে তোলা যেসব ছবি আমাদেরকে সরবরাহ করেছিল তাতে আবাদান দ্বীপ এবং আরভান্দ নদীর আশপাশের খেজুর বাগানগুলোতে কালো কালো স্পট দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এসব ছবি দেখে ইরানি বাহিনীর অবস্থান এবং তারা ঠিক কি করতে চায় তা বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না।
ওয়ালফাজর-৮ অভিযানের পর ইরাকিদের ফেলে যাওয়া দলিলে দেখা যায়, ইরাকি বাহিনীর ১১১ নম্বর ব্রিগেড কমান্ডার তার কমান্ডিং অফিসারকে জানান, আরভান্দ নদীর ওপারে ইরানের ৪০০টি ল্যাডার, বুলডোজার ও লরি ইঞ্জিনিয়ারিং তৎপতা চালাচ্ছে। তিনি ইরানি যোদ্ধাদের সামরিক তৎপরতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, ইরানি যোদ্ধারা অবশ্যই এই অঞ্চলে অভিযান চালাতে চায়। কিন্তু ইরাকের সপ্তম সেনা কমান্ডের প্রধান মাহের আব্দুর রশিদ জবাবি চিঠিতে লেখেন, আবাদান ও ফাও এলাকায় ইরানিরা অভিযান চালাবে না; আপনি শুধু শুধু আমাদের সেনাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করবেন না।
কিন্তু ইরাকি সেনা কমান্ডারদের সব ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ করে দিয়ে ইরানি যোদ্ধারা অল্প কয়েকদিনে কৌশলগত ফাও দ্বীপ দখল করে নেন। গত আসরে যেমনটি বলেছি, তারা সেতু নির্মাণের পরিবর্তে সারারাত ধরে গানবোটে করে হাজার হাজার যোদ্ধাকে আরভান্দ নদীর ওপারে নিয়ে যান। অভিযানের চতুর্থ দিনে ইরানি যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে ইরাকের প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট তলব করা হয়। সে সময় এই রেজিমেন্ট ছিল ইরাকের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত ও দুর্ধর্ষ বাহিনী। কিন্তু ফাও দ্বীপে এই বাহিনী কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় এবং ইরানি যোদ্ধাদের হাতে মার খেয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। ইরাকের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের অবশিষ্ট সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সেনা যখন প্রত্যাহার করা হচ্ছিল তখন ইরাকি কমান্ডাররা রাসায়নিক গোলা ব্যবহার করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ভুল করে একটি গোলা প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের দু’টি ব্রিগেডের মাঝখানে বিস্ফোরিত হয়। এ অবস্থায় গার্ড রেজিমেন্ট ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাগদাদের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠায়। কিন্তু তারা ইরানি যোদ্ধাদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়ায় তাদের কাছে সাহায্য পাঠানো সম্ভব ছিল না। অবশ্য কষ্টেসৃষ্টে ইরাকি সেনাবাহিনীর সপ্তম ডিভিশন থেকে গার্ড রেজিমেন্টের সহায়তায় ৪৩৩ নম্বর ব্রিগেডটি পাঠানা হয়। কিন্তু এই সেনাদের মাঝখানে ইরানি যোদ্ধাদের নিক্ষিপ্ত একটি গোলা বিস্ফোরিত হলে ব্রিগেডটি সাহায্য করার পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্র পালিয়ে যায়। এ সময় ইরাকি বাহিনীর ওপর ভারী কামানের গোলাবর্ষণ বেশ কাজে আসে।
এ সময়কার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ইরাকি প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের ৪ নম্বর ব্রিগেডের কমান্ডার নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এক রিপোর্টে জানান: “আমাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ইরানিদের গোলার আঘাতে প্রতি মিনিটে আমাদের সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমরা প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছি তবে অবিলম্বে আমাদের সাহায্যে সেনা পাঠান।” ওই ইরাকি কমান্ডার আরো জানান: আমরা চারদিক দিয়ে শত্রু সেনাবেষ্টিত হয়ে পড়েছি। অবিলম্বে একটি সাঁজোয়া ব্রিগেড পাঠিয়ে আমাদের পালানোর পথ করে না দিলে আমরা বেঘোরে প্রাণ হারাব।” এ অবস্থায় ইরাকি কমান্ডিং অফিসার উত্তর দেন: “আপনারা যুদ্ধ করতে করতে পশ্চাদপসরণ করুন, কারণ আপনাদের ঘেরাও হয়ে পড়ার খবর বাগদাদে পাঠানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সম্মান রক্ষা করে পিছু হটে আসুন, আপাতত আমাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।”
এই নির্দেশ পাওয়ার পর ইরাকি গার্ড রেজিমেন্টের সেনারা প্রায় ১৬ ঘণ্টা ইরানি যোদ্ধাদের হাতে মার খাওয়ার পর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে তাদের খুব অল্প সংখ্যক সেনা সেদিন পালাতে পেরেছিল। বাকি সেনাদের লাশ কৌশলগত মহাসড়কের দুই পাশে পড়ে থাকে। ইরাকি বাহিনীর অসংখ্য ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়ে যায়। ইরাকের শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের এই শোচনীয় পরাজয়ের খবর পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে প্রচারিত হয়। মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়: গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ইরাক-ইরান যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী পশ্চিমা সমরবিদরা মনে করছেন, ফাও দ্বীপে জল, স্থল ও আকাশপথে ইরানের অকস্মাৎ আক্রমণে ইরাকের অন্তত ১০ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে। সেইসঙ্গে ইরাকের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট অপমানজনকভাবে পরাজিত হয়েছে।
ইরাকে দুর্ধর্ষ প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের পক্ষে এই পরাজয় সহজভাবে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এ কারণে ইরানি যোদ্ধাদের হাত থেকে যেকোনো উপায়ে ফাও দ্বীপ পুনরুদ্ধারের জন্য সে তার বাহিনীকে নির্দেশ দেয়। এ অবস্থায় সাদ্দাম বাহিনী ফাও দ্বীপে মোতায়েন ইরানি যোদ্ধাদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০১
bangla news।













































