প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ছে, করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ

0
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

ঋতু বৈচিত্রের বাংলাদেশে এখন বজ্র বৃষ্টির সময়। প্রায় প্রতিদিনই মেঘ-বৃষ্টি-বজ্রপাত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। বজ্রপাতে প্রাণহানিও ঘটছে উদ্বেগজনক হারে।

সরকারি হিসাবে এ বছর প্রথম ছয় মাসে বজ্রপাতে মারা গেছেন ১১০ জন আর বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা ২৩০। চলতি জুনের প্রথম সপ্তাহেই বজ্রপাতে সারাদেশে ৫৬ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ হয়েছে। তাদের মধ্যে- ৭ জুন মারা গেছেন ৯ জন, ৬ জুন ২৫ জন, ৫ জুন ৭ জন, ৪ জুন ৯ জন, ৩ জুন ৫ জন এবং ১ জুন একজনের মৃত্যু হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল এই ভৌগলিক অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই বেশি বজ্রপাত হয়। কেননা, এই অঞ্চলে বজ্র মেঘের সৃষ্টিই হয় বেশি। দেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় মার্চ থেকে জুন মাসে। তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। আর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত। এসময় মাঠে কাজ করা কৃষক বা নদী-হাওরে মাছধরা জেলে এবং ঝড়বৃষ্টির সময়ে ঘরের বাইরে থাকা মানুষ  বেশী বজ্র দুর্যোগের শিকার হয়ে মারা যান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মৃত্যু বরণ করেছেন ২ হাজার ১৬৪ জন মানুষ। এক্ষেত্রে ২০১৮ সালে একম বছরে সর্বোচ্চ  সংখ্যক  ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ১৬৮ জন ও ২০২০ সালে ২৩৬ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২১৬ জনের বেশি মানুষ প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে মৃত্যুবরণ করেছে। এ কারণে সরকার বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকাভুক্ত করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বজ্রপাত নিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে মৃত্যু হার কমানো সম্ভব।

তালগাছ

ভরসা তালগাছ

বজ্রপাতে মৃত্যু হ্রাস প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মহসীন গণমাধ্যমকে বলেছেন, বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে খোলা স্থানে বজ্র নিরোধক তালগাছ রোপণ কাজ চলছে এবং বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং  পূর্বাভাষ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ও আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের সাবেক ডিন ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেছেন, বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। এতে মানুষ আগাম সতর্ক হতে পারলে স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

এদিকে আগাম সতর্কতা জানানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে বলে দাবি করছে ঢাবির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ। তারা আবহাওয়া অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য আলোচনার উদ্যোগও নিচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার এর আগে তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি হাতে নিলেও বর্তমানে মৃত্যু হার বাড়ায় পরিকল্পনা নিয়েছে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের। এক্ষেত্রে হাওর অঞ্চলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া জাতীয় বিল্ডিং কোডে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বসানো বাধ্যতামূলক করেছে সরকার।

যেহেতু এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয় সেও জন্য এ সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করা, দ্রুত দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া, জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায় অবস্থান না করা এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকা- এসব সতর্কাতামূলক পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ।

এছাড়া, দুর্যোগপুর্ণ  সময়ে  খোলা স্থান, খেলার মাঠ বা ছাদে এবং মেঘ-বৃষ্টির মাঝে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয় পানিতে অবস্থান না করার  পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের

ওবায়দুল কাদের কী বলেন

বজ্রপাত নিয়ে এক তীর্যক মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের সড়ক-সেতুমন্ত্রী ও ওবায়দুল কাদের। গতকাল ( ৮ জুন) রাজধানীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে করোনাভাইরাসের সুরক্ষার সামগ্রী বিতরণের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর জন্যও হয়ত বিএনপি একদিন সরকারকে দায়ী করতে পারে। কারণ, বিএনপি সবকিছুতে সরকারের দোষ খোঁজে।

“আমি মাঝে মাঝে ভাবি বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তারা আবার নাকি বলে যে আওয়ামী লীগই দায়ী। কখন আবার বজ্রপাতে মৃত্যুর জন্য শেখ হাসিনার সরকারকে দায়ী করে। সেটাই আমি ভাবছি।”

এ খবরটি পড়ে একজন অনলাইন পাঠক মন্তব্য করেছেন, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে এর প্রতিকারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তখন এক কোটি তালগাছ লাগানো এবং বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর এসে দেখা গেল, ‘কাজির গুরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। ভিয়েতনাম বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার তৈরি করে সুফল পেয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও নেপালের তরা এলাকায় তালগাছ লাগানোয় বজ্রপাতের হার অনেক কমেছে। প্রশ্ন একটাই- আমরা কি করেছি।” 

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে করণীয়

বজ্রপাতের সময় মৃত্যু এড়াতে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। সেগুলো হলো-

পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিন: ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় থাকা যাবে না। এ অবস্থায় সবচেয়ে ভালো হয়, কোনো দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে।

উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকুন: সাধারণত উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এসব জায়গায় যাবেন না বা কাছাকাছি থাকবেন না। ফাঁকা জায়গায় কোনো যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে।

জানালা থেকে দূরে থাকুন: বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতর থাকুন।

ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলুন: বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে আহত হন।

টিভি-ফ্রিজ থেকে সাবধান: বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরবেন না। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখুন।

গাড়ির ভেতরে থাকলে: বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ অবস্থানে ফেরার চেষ্টা করুন। যদি প্রচণ্ড বজ্রপাত ও বৃষ্টির সম্মুখীন হন, তবে গাড়ি কোনো গাড়িবারান্দা বা পাকা ছাউনির নিচে নিয়ে যান। এ সময় গাড়ির কাঁচে হাত দেয়া বিপৎজনক হতে পারে।

পানিতে নামা যাবে না: ঝড়-বৃষ্টির সময় রাস্তায় পানি জমাটা আশ্চর্য নয়। তবে বাজ পড়া অব্যাহত থাকলে সে সময় রাস্তায় বের না হওয়াই মঙ্গল। একে তো বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। উপরন্তু কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লে বিদ্যুত্‍স্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়।

খালি পায়ে বা পা খোলা জুতো নয়: বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। যদি একান্ত বেরোতেই হয়, তবে পা ঢাকা জুতো পরে বের হন। রাবারের গামবুট এক্ষেত্রে সব চেয়ে ভালো কাজ করবে।

চারপাশে খেয়াল রাখুন: বজ্রপাতের সময় রাস্তায় চলাচলের সময় আশেপাশে খেয়াল রাখুন। যেদিকে বাজ পড়ার প্রবণতা বেশি সেদিকটি বর্জন করুন। কেউ আহত হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৭

bangla news।