
মহান আল্লাহর আসমাউল হুসনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম লাত্বিফ। পবিত্র কুরআনে কয়েকবার এই নাম এসেছে।
মহান আল্লাহ এই নামের আলোকে সূক্ষ্মদর্শিতা ও সচেতনতা বজায় রেখে তাঁর সৃষ্টির প্রতি সর্বোচ্চ দয়া ও ভালবাসা দেখিয়ে থাকেন। লাত্বিফ শব্দের নানা অর্থ রয়েছে। যেমন, ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম বস্তু বলতে লাতিফ শব্দের ব্যবহার রয়েছে। ভারী দেহের বিপরীতে হাল্কা দেহ বোঝাতেও এই শব্দের ব্যবহার রয়েছে। গতির ক্ষেত্রে যখন এই শব্দ ব্যবহার করা হয় তখন এর অর্থ হল একটি সংক্ষিপ্ত ও অতি ক্ষুদ্র যাত্রা। আত্মার মত অবস্তুগত বিষয়গুলোকে বোঝাতেও কখনও কখনও লাত্বিফ শব্দ ব্যবহার করা হয়। তবে মহান আল্লাহ লাত্বিফ-এই কথার অর্থ আল্লাহ কল্পনাতীতভাবে সূক্ষ্মদর্শিতা বা সূক্ষ্মতার অধিকারী। অর্থাৎ বিষয়টি এমনই সূক্ষ্ম যে মহান আল্লাহর এই বৈশিষ্ট্যের সমকক্ষ কিছু নেই বলে আল্লাহর এই বৈশিষ্ট্য প্রকৃতপক্ষে বর্ণনাতীত এবং অনুভবের উর্দ্ধের বিষয়। সুরা আনআমের ১০৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহকে লাত্বিফ ও খাবির বলা হয়েছে। এ আয়াতে বলা হয়েছে: চোখগুলো বা দৃষ্টিগুলো তাঁকে বুঝতে পারে না তথা তিনি দৃষ্টির অগোচর, অবশ্য তিনি দৃষ্টিগুলোকে দেখতে ও বুঝতে পারেন। তিনি অত্যন্ত সুক্ষদর্শী, সুবিজ্ঞ।
লাত্বিফ শব্দটি এসেছে লুত্ব্ফ্ থেকে। আর এই লুত্বফ্ শব্দের অর্থ অন্যদের সঙ্গে কোমল ও দয়ার্দ্র আচরণ করা বা অন্যদের সঙ্গে বৈরিতায় না গিয়ে নিজেকে মানিয়ে নেয়া। তাই মহান আল্লাহ লাত্বিফ এই অর্থও অনেকটা এমন যে আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করেন না বরং সহনশীল আচরণ করেন এবং তারা যাতে কল্যাণ ও পূর্ণতা অর্জন করে মহান আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। মহান আল্লাহ লাত্বিফ মানে আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের প্রতি অত্যন্ত অকল্পনীয় মাত্রায় দয়ার্দ্র ও সহৃদয়। সন্তানের জন্য মায়ের দয়া, ধৈর্য, ক্রমবর্ধমান ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার আর ভালোবাসাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বলে মনে করা হয়। সন্তানের কষ্টে মা গভীর কষ্ট অনুভব করেন। আর সন্তানের স্বস্তি ও আনন্দে মাও গভীর আনন্দ অনুভব করেন। সন্তানের সুখের জন্য মা জীবন বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত থাকেন। মায়ের মনের এই যে সূক্ষ্ম দয়া, ভালোবাসা ও করুণা তা মহান আল্লাহরই দান। আল্লাহ বান্দাহদের প্রতি মায়ের চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি তথা অকল্পনীয় পর্যায়ে বেশি দয়ার্দ্র। মহান আল্লাহ মানুষের কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ, পূর্ণতা ও চূড়ান্ত সৌভাগ্যের জন্য নাজিল করেছেন বিধি-বিধান যাতে মানুষ তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছার সরল পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। মহান আল্লাহর লাত্বিফ বৈশিষ্ট্য মুমিনের সৌভাগ্যের পথ সুগম করে এবং বান্দাহ অজস্র পাপ করা সত্ত্বেও সে যখন অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে আল্লাহ তখন তাকে ক্ষমা করেন। হাদিসে বলা হয়েছে: কোনো ব্যক্তি যখন রাতের অন্ধকারে তার উট, পাথেয় এবং তার পরিবার-পরিজনকে মরুভূমির মধ্যে হারিয়ে ফেলে অত্যন্ত পেরেশান হয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর হঠাৎ কোথাও তাদের দেখতে পেয়ে তথা খুঁজে পেয়ে যেমন খুশি হয় তওবাকারী বান্দাহর প্রতি করুণাময় আল্লাহ তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি খুশি হন। মহান আল্লাহ মানুষের চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ সুখের জন্য সব ব্যবস্থা করে দেয়া সত্ত্বেও খুব কম মানুষই মহান আল্লাহর অপার করুণার কথা উপলব্ধি করতে পারে। সুরা মুলক-এর ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: যিনি সব সৃষ্টি তথা সৃষ্টিকুলের স্রস্টা তিনি জানবেন না- এটা কি সম্ভব? তিনি সব বিষয়ে সূক্ষ্ম-জ্ঞানী ও সম্যক জ্ঞাত।
লাত্বিফ শব্দের একটি অর্থ হল নানা কাজ আর বিষয়ে খুব বিস্তারিত ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে জানা। মহান আল্লাহ ছোট ও বড় সব ধরনের সৃষ্টি সম্পর্কে পরিপূর্ণ এবং যথাযথ জ্ঞান ও সূক্ষ্মদর্শিতা রাখেন। সুরা ইউসুফের ১০০ নম্বর আয়াতেও মহান আল্লাহ নিজের অন্যতম নাম হিসেবে লাত্বিফ শব্দটি উল্লেখ করে বলেছেন: আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে যথাযথভাবে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।– ইমাম রেজা (আ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আল্লাহকে লাত্বিফ বলা হয় কারণ তিনি অতি সূক্ষ্ম ও ক্ষুদ্র বা কোমল বিষয় যা কেউ দেখে না বা জানে না কিংবা অর্জন করতে সক্ষম নয় সেসব সম্পর্কে মহান আল্লাহ জানেন। তোমরা কি সূক্ষ্ম ও অসূক্ষ্ম গাছপালায় মহান আল্লাহ শিল্প-নৈপূন্য দেখো না? সৃষ্টিকুলের মধ্যে ও ক্ষুদ্র প্রাণী এবং এমনকি কখনও চোখে দেখা যায় না এমন আরো ক্ষুদ্র জিনিস ও কীটপতঙ্গের মধ্যে কিংবা অস্বাভাবিক অতি ক্ষুদ্র যা কিছু আছে, নারী ও পুরুষ প্রজাতির, নতুন ও পুরনো প্রজাতির কিনা যা বোঝা যায় না-সেসবও কি মহান আল্লাহর সূক্ষ্ম শিল্প-নৈপুন্য নয়? এ ধরনের জীব ছাড়াও যা যা আছে মহাসাগরে ও গাছগুলোর ভেতরে, মরুভূমিতে ও ধু ধু প্রান্তরে – এসব কখনও আমাদের চোখ দেখতে পায় না। আমরা সেগুলোকে হাত দিয়ে ধরে দেখতেও পারি না! -এসব কিছু থেকেই বুঝতে পারি যে মহান আল্লাহ লাত্বিফ।
আসলে সব কিছুর মধ্যেই ছড়িয়ে আছে মহান আল্লাহর লাত্বিফ নামের প্রভাব। বিশ্বের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে নেই এই নামের প্রভাব। এ নামের প্রভাবেই মাটির নীচে থাকা বীজ থেকে মধ্যাকর্ষণ সূত্রের বিপরীতে মাটি ভেদ করে বেরিয়ে আসে চারা। এরপর সে চারা সূর্যের তাপ ও প্রশান্ত সমীরণের স্পর্শে এসে বেড়ে ওঠে। এর আশপাশ নরম হয়ে ওঠে বৃষ্টির পানিতে। এই চারা এক সময় হয়ে ওঠে বিশাল বৃক্ষ অথবা ফুল ও ফলে সুশোভিত মাঝারি সাইজের গাছ। প্রখ্যাত মনীষী মহিউদ্দিন আরাবির মতে মহান আল্লাহ খুবই গোপন। আর এর কারণ হল তাঁর তীব্র প্রকাশ্যতা। যেখানেই আপনি চোখ ঘুরাবেন সেখানেই আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পাবেন এবং সেখানেই আল্লাহর দয়া ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাবেন না।
– মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন দয়া করে ও আমাদের জন্য যেসবের ব্যবস্থা করে রেখেছেন সেসবই আল্লাহর অশেষ দয়া বা লাত্বিফ নামেরই প্রকাশ। আমরা আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তা যদি ক্ষতিকর না হয় তবে তা দেয়াকে নিজ কর্তব্য মনে করেন করুণাময় আল্লাহ। কখনও যা চাই তার চেয়েও ভালো কিছু দেন। তাঁকে চাইলে তিনিই আমাদের দেন আশ্রয়। আমরা যদি আল্লাহর দাওয়াত গ্রহণ করি তাহলে তিনি আামদের কাছে আসেন ও ঘনিষ্ঠ হন। তাঁর আনুগত্য করলে তিনি আমাদের জন্য অভিভাবক হয়ে যান। তার কাছ থেকে দূরে যেতে চাইলে তিনি আমাদের কাছে ডাকেন। তাঁর দিকে মুখ ফেরালে তিনি আমাদের পথ দেখান।
আল্লাহ মানুষকে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা দিয়েছেন। তাই আমরাও হতে পারি আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী মহান আল্লাহ লাত্বিফ নামের প্রকাশ। এ নামের রঙে রঙিন হতে হলে আল্লাহর সব সূক্ষ্মদর্শিতা ও অনুগ্রহকে মন-প্রাণ দিয়ে অনুভব করতে হবে। ইবাদতে হতে হবে আন্তরিক এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সতর্ক করতে হবে। মানুষের সংশোধন ও উপকারের জন্য হতে হবে বাবা-মায়ের মতই সহৃদয়, তবে এ সংক্রান্ত কাজ করে যেতে হবে নিজের এ পরিচয় গোপন রেখেই।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০৭
bangla news।






