প্রচ্ছদ দৈনিক খবর

কল রে’কর্ডে যেভাবে ফাঁ’সলেন বাবুল

30
Facebook
Twitter
Pinterest
WhatsApp
LINE

২০১৬ সালের ৫ জুন সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে চট্টগ্রামের বহুল আ’লোচিত মুছার মোবাইল ফোনে কল যায় তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তারের মোবাইল ফোন থেকে। মাত্র ২৭ সেকেন্ডের মোবাইল ফোনের কথোপকথনের রে’কর্ডটিই এখন মিতু হ’ত্যার প্রধান আ’লামত ও সা’ক্ষী।পু’লিশে চাকরি হওয়ার পর পারিবারিকভাবে মাহমুদা খানম মিতুর স’ঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তখনকার সহকারী পু’লিশ সুপার বাবুল আক্তারের। বাবুলের বাবা মো. আব্দুল ওয়াদুদ ছিলেন পু’লিশের উপপরিদ’র্শক। আর মিতুর বাবা মো. মোশারফ হোসেন ছিলেন পু’লিশ প’রিদর্শক।

পু’লিশের দুই সদস্যের প’রিবারের ছেলে-মে’য়ের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল আনন্দঘন পরিবেশেই। দাম্পত্যজীবনে দুই স’ন্তানের জনক-জননী হয়েছিলেন বাবুল-মিতু। কিন্তু বিয়ের তিন-চার বছরের মধ্যেই অ’শান্তি তৈরি হয়েছিল তাঁদের দাম্পত্যজীবনে।

পরে এর সঙ্গে যোগ হয় আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার কর্মী এক না’রীর স’ঙ্গে বাবুলের স’ম্পর্কের ঘ’টনা। এতে আরো তীব্র হয়েছিল তাঁদের দাম্পত্য কলহ। এরই জে’র ধ’রে বাবুল মিতুকে ভাড়াটে খু’নি দিয়ে হ’ত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—পু’লিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ত’দন্তে এমন ত’থ্যই উঠে আসছে।

যদিও পাঁচ দিনের রি’মান্ডে থাকা বাবুল আক্তার রবিবার পর্যন্ত স্ত্রীকে হ’ত্যার জন্য তাঁর সোর্স কামরুল ই’সলাম সিকদার ওরফে মুছাকে ভাড়া করা এবং বিকাশে টাকা পাঠানোর ত’থ্য স্বীকার করেননি। তবে গত ১১ মে চট্টগ্রামমহানগর হাকিম শফিউদ্দীনের আ’দালতে বাবুলের ব্যাবসায়িক অংশীদার সাইফুল হক ও গাজী আল মামুন যে জবানব’ন্দি দিয়েছেন, সেখানে মুছাকে টাকা পাঠানোর বিষয় এসেছে।

সাইফুল হক জানিয়েছেন, মিতু হ’ত্যাকা’ণ্ডের তিন দিন পর বাবুল আক্তারের নি’র্দেশে গাজী আল মামুনের মাধ্যমে মুছার কাছে তিন লাখ টাকা পাঠানো হয়। মামুনও বিকাশের মাধ্যমে মুছাকে টাকা পাঠানোর ত’থ্য আ’দালতকে জানিয়েছেন।

সাইফুলের জবানব’ন্দি অনুযায়ী, তিনি ও বাবুল বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধু। তাঁর প্রিন্টিং ব্যবসায় বাবুল আক্তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর নামে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই বিনিয়োগের টাকা থেকে বাবুলের নি’র্দেশে মুছাকে ওই তিন লাখ টাকা পাঠানো হয়।

সাইফুল ও গাজী মামুন দুজন অভিন্ন সাক্ষ্য দেওয়ার পরই বাবুল যে খু’নের নি’র্দেশদাতা এবং ভাড়াটে খু’নি দিয়ে স্ত্রীকে হ’ত্যা করিয়েছেন এই বিষয়ে নিশ্চিত হন ত’দন্তকারী কর্মক’র্তা। এ ত’থ্য পাওয়ার কথা বাবুল আক্তার বা’দী হয়ে দা’য়ের করা মা’মলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন এই কর্মক’র্তা।

গত ১২ মে চট্টগ্রাম মহানগর আ’দালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এরপরই মিতুর বাবা বা’দী হয়ে পাঁচলাইশ থা’নায় বাবুল আক্তারসহ আট জনকে আ’সামি করে নতুন মা’মলা দা’য়ের করেন। সেই মা’মলায় বাবুলকে ওই দিনই গ্রে’প্তার করা হয়। এই মাম’লারও ত’দন্ত কর্মক’র্তা সন্তোষ কুমার চাকমা।

বাবুল-মিতুর দাম্পত্যজীবনে কলহ থাকার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে মা’মলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন। তিনি এজাহারে গায়ত্রী অমর সিং নামের এক না’রীর স’ঙ্গে বাবুলের পর’কীয়া প্রে;মের ত’থ্য দিয়েছেন। গায়ত্রীর বিষয়ে এখন অনুস’ন্ধান চালাচ্ছে পিবিআই।

বাংলাদেশ থেকে তিনি জার্মান গিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে খোঁ’জ নিচ্ছেন ত’দন্তকারী কর্মক’র্তা। ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ের কাছে মুছা সিকদারসহ ভাড়াটে খু’নিরা মিতুকে স’ন্তানের সামনে নি’র্মমভাবে হ’ত্যা করেছিল।

ওই সময় বাবুল আক্তার পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় পু’লিশ সদর দপ্তরে ছিলেন। পরে চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি পাঁচলাইশ থা’নায় মা’মলা করেন। মা’মলাটি ত’দন্ত শুরু করে ডিবি। ওই সময় কয়েকজনকে গ্রে’প্তার করা হয়। সে সময় মাত্র ২৭ সেকেন্ডের মোবাইল ফোনের কথোপকথনের একটি রে’কর্ড পাওয়া যায়।

সালাম দিয়ে মুছা ফোনটি রিসিভ করতেই ওপার থেকে বাবুল আক্তার বলেন, ‘তুই কো;পালি ক্যান? ৩/৪ সেকেন্ড থেমে আবার বলেন, বল তুই কো;পালি ক্যান? তোরে কো;পাতে কইছি? ওপার থেকে মুছার কথা, না মানে’।’ বাবুল আক্তার ফোনটি কে’টে দেন।

এই ২৭ সেকেন্ড কলের কথোপকথনের রে’কর্ড পেয়েই বাবুল আক্তারকে ঢাকায় পু’লিশের গো’য়েন্দা কার্যালয়ে ১৫ ঘণ্টা জি’জ্ঞাসাবা’দ করা হয়। পরে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওই সময়ই ত’দন্তে মোড় ঘুরে যায়। মিতু হ’ত্যাকা’ণ্ডে বাবুলের জ’ড়িত থাকার অ’ভিযোগ ওঠে। মিতুর মা-বাবাও দা’বি করেন, এই হ’ত্যাকা’ণ্ডে বাবুল জ’ড়িত। গত বছর মা’মলাটি ত’দন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মিতুর বাবার করা নতুন মা’মলায় বাবুলকে প্রধান আ’সামি করা হয়। এ ছাড়া আরো সাতজনকে আ’সামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন কামরুল ই’সলাম শিকদার ওরফে মুছা, এহতেশামুল হক ভোলা, মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খায়রুল ই’সলাম কালু ওরফে কসাই কালু, মো. সাইদুল ই’সলাম শিকদার ওরফে সাকু ও শাহজাহান মিয়া।

আগের মা’মলায় ওয়াসিম ও আনোয়ারকে গ্রে’প্তার করা হয়েছিল। তাঁদের দুজনকে নতুন মা’মলায় গ্রে’প্তার দেখানোর জন্য আ’দালতে আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া সাকু তিন দিনের রি’মান্ডে আছেন। আগের মা’মলায় ত’দন্ত কর্মক’র্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদ’র্শক সন্তোষ কুমার চাকমা যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন, সেখানে হ’ত্যাকা’ণ্ডে বাবুল আক্তারের জ’ড়িত থাকার ত’থ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া বাবুল আক্তারের মাধ্যমে সোর্স মুছা কিভাবে যুক্ত হয়েছেন, সেই বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে। নতুন মা’মলায় বাবুল আক্তারের পাঁচ দিনের রি’মান্ড মঞ্জুর করেন আ’দালত। সোমবার রি’মান্ড শে’ষে তাঁকে আ’দালতে হাজির করা হবে বলে জানিয়েছেন মা’মলার তদ’ন্তকারী কর্মক’র্তা সন্তোষ চাকমা।

রি’মান্ডে নেওয়ার পরপরই বাবুলকে জি’জ্ঞাসাবা’দের জন্য একাধিক দল গঠন করে পিবিআই। কোন দলে কে থাকবেন, কে কী প্রশ্ন করবেন, কোন দল কখন জি’জ্ঞাসাবা’দ করবে এমন প্রতিটি বিষয় ঊর্ধ্বতন ক’র্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিয়েছে। জি’জ্ঞাসাবা’দের সময় প্রশ্নের জবাবে বাবুল কী উত্তর দিচ্ছেন, সেটাও সার্বক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন ক’র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে।

যে প্রশ্নের উত্তর খুঁ’জছে ত’দন্ত সংস্থা : বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু প’রকীয়া প্রে;মের বলি হয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁ’জছে পিবিআই। মিতুর বাবা যে মা’মলাটি দা’য়ের করেছেন, সেখানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার

(ইউএনএইচসিআর) কর্মী গায়ত্রী অমর সিং নামে এক না’রীর ত’থ্য এসেছে। আর ত’দন্ত পর্যায়ে পিবিআই জানতে পেরেছে যে এই না’রীর স’ঙ্গে বাবুল আক্তারের শা’রীরিক স’ম্পর্ক ছিল। মিতু তাঁর এই স’ম্পর্কের বিষয়টি জানার পরই তাঁদের দাম্পত্য কলহ তীব্র হয় বলে ত’থ্য পেয়েছে পিবিআই।

ত’দন্ত সূত্রে জানা গেছে, পিবিআই এমন দুটি বই পেয়েছে, যেগুলো বাবুলকে উপহার দিয়েছিলেন গায়ত্রী। সেই বইয়ে গায়ত্রী ও বাবুল কিছু বিষয় লিখেছেন, যেগুলো এখন মিতু হ’ত্যা মা’মলায় বাবুলের দা’য় প্র’মাণে সহায়ক বলেপিবিআই মনে করছে। আবার মিতুর একটি ডায়েরি পাওয়া গেছে, যেখানে দাম্পত্য কলহ এবং গায়ত্রী স’ম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ত’থ্য পাওয়া গেছে। হাতের লেখাগুলো মিলিয়ে দেখার পর এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মক’র্তারা।

মিতুর বাবা এজহারে উল্লেখ করেছেন যে কক্সবাজার জে’লায় অতিরিক্ত পু’লিশ সুপার পদে কর্মরত থাকার সময় ২০১৩ সালে ইউএনএইচসিআর কর্মী গায়ত্রী অমর সিংয়ের স’ঙ্গে সম্পর্কে জ’ড়িয়ে পড়েন বাবুল। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সুদানে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে ছিলেন বাবুল। এই সময় তাঁর মোবাইল ফোনসেটটি চট্টগ্রামের বাসায় ছিল। ওই মোবাইল ফোনে মোট ২৯ বার বার্তা পাঠান ভারতীয় নাগরিক গায়ত্রী।

এজাহারের বরাত দিয়ে ত’দন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গায়ত্রী যে দুটি বই বাবুল আক্তারকে উপহার দিয়েছিলেন তার একটির তৃতীয় পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে ‘05/10/13, Coxs Bazar, Bangladesh. Hope the memory of me offering you this personal gift. shall eternalize our wonderful bond, love you. Gaitree.’একই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা ২৭৬-এর পরের পাতায় তিনি লিখেছেন (বাবুল) ‘First Meet : 11 Sep, 2013, First Beach walk 8th Oct 2013, G Birth day 10 October, First kissed 05 October 2013, Temple Ramu Prayed together, 13 October 2013, Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk.’

বি’মর্ষ বাবুল চুপ, কখনো কাঁ’দছেন : মা’মলার ত’দন্তকারী কর্মক’র্তা সন্তোষ কুমার চাকমা প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আ’সামিকে জি’জ্ঞাসাবা’দ করা হচ্ছে। তিনি বেশির ভাগ প্রশ্নের জবাবে চুপ থাকছেন। কখনো কখনো কাঁ’দছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রি’মান্ড শে’ষে আ’সামিকে সোমবার আ’দালতে সোপর্দ করা হবে।’ত’দন্তসংশ্লিষ্ট কর্মক’র্তারা জানিয়েছেন, বাবুল আক্তার জে’রার মুখে স্বীকার করেছেন যে তাঁদের সাংসারিক জীবনে অ’শান্তি ছিল। কিন্তু খু’নি ভাড়ার বিষয়ে এখনো মুখ খোলেননি। আর পারিপার্শ্বিক যেসব প্রশ্ন করা হচ্ছে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন কৌশলে নিজকে না জ’ড়িয়ে। একাধিক প্রশ্নের উত্তরে বাবুল আক্তার বি’র্মষ হয়ে থাকছেন, নীরব

থাকছেন কিংবা নীরবে কাঁ’দছেন। মুছা সিকদারকে চেনেন কি না এবং সোর্স ছিলেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বাবুল জানিয়েছেন, মুছা তাঁর সোর্স ছিলেন। তবে শুধু তাঁর (বাবুলের) নয়, অন্য দুই সংস্থার সোর্সও ছিলেন মুছা।সংশ্লিষ্ট কর্মক’র্তারা আরো জানান, বাবুলকে জি’জ্ঞাসাবা’দে তাঁরা জানতে পেরেছেন যে বাবুল-মিতুর দাম্পত্য ক’লহের কারণে দুই পরিবারের মধ্যেই অ’শান্তি দেখা দিয়েছিল। ওই সময় মিতুর বাবা যে জে’লায় কর্মরত ছিলেন সেই জে’লার

পু’লিশ সুপারও বিষয়টি জানতেন। এমনকি ওই পু’লিশ সুপারের বাসায় বৈঠকও হয়েছিল। ওই পু’লিশ সুপার দুই পু’লিশ পরিবারের মধ্যে মিলেমিশে থাকার পরাম’র্শ দিয়েছিলেন। বাবুল আক্তারকেও নানা ইতিবাচক পরাম’র্শ দিয়েছিলেন।বাবুল আক্তার আ’দালতে স্বী’কারোক্তিমূল’ক জবানব’ন্দি দেবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ত’দন্তকারী কর্মক’র্তা সন্তোষ কুমার চাকমা বলেছেন, ‘আ’দালতে স্বী’কারোক্তিমূলক জবানব’ন্দি দেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন আ’সামি।’