মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে খুব সহজ উপায়ে ঘরে তৈরি করুন মাউথওয়াশ

মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে খুব সহজ উপায়ে ঘরে তৈরি করুন মাউথওয়াশ
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

শরীরের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হোল মুখ এবং দাঁত।দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে নিয়মিত জরুরি নিয়মিত পরিচর্যা। নইলে দুর্গন্ধ, ক্যাভিটি, প্লাক জমা, এনামেল নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানান সমস্যা দেখা দিতে পারে। দিনে অন্তত দু’বার দাঁত ব্রাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু শুধু দাঁত ব্রাশ করলেই তো আর নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না! সঙ্গে চাই উপযুক্ত মাউথওয়াশ। কারণ মাউথওয়াশ শুধুমাত্র যে মুখের দুর্গন্ধ নাশ করে তা নয়। মুখ গহ্বরের সুস্বাস্থ্যও রক্ষা করে। তাই চলুন দেখে নেওয়া যাক, ঘরোয়া উপায়ে কিভাবে বানাবেন মাউথওয়াশ!

বেকিং সোডা: আধা চা চামচ বেকিং সোডা আধা গ্লাস ‍কুসুম গরম জলে মিশিয়ে নিলেই একধরনের মাউথওয়াশ তৈরি হয়ে গেলো। দাঁত ব্রাশ করার পর কিংবা দিনের যেকোনো সময় শুধু এই মিশ্রণ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিতে পারেন। মুখের দুর্গন্ধ ও ব্যাকটেরিয়া দূর করতে বেকিং সোডা অত্যন্ত কার্যকরী।

নারকেল তেল: এই পদ্ধতির নাম ‘ওয়েল পুলিং’, যার জন্য চাই এক চা চামচ নারিকেল তেল। তেলটুকু মুখে নিয়ে কিছুক্ষণ কুলি করতে হবে। পরে তেল ফেলে দিয়ে জল দিয়ে ভালোভাবে কুলি করতে হবে। মুখ পরিষ্কারের পাশাপাশি শরীরের বিষাক্ত উপাদান অপসারণেও সহায়ক ভূমিকা রাখে এই পদ্ধতি। দাঁতে ‘প্লাক’ জমাও রোধ করে।

নুন: নুন-জল দিয়ে কুলকুচি করা সম্পর্কে অনেকেই জানেন। এখানেও চাই আধা গ্লাস কুসুম গরম জল আর আধা চা চামচ নুন। একসঙ্গে মিশিয়ে নিলেই কাজ শেষ। বাজারের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাউথওয়াশের মতোই কার্যকরী এটি।

অ্যালোভেরা: আধা কাপ অ্যালোভেরা আর আধা কাপ জল একসঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। প্রতিবার দাঁত ব্রাশ করার হয় এই মিশ্রণ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে হবে। দাঁতে ‘প্লাক’ জমা রোধ করে এবং মাড়ির রক্তক্ষরণ বন্ধ করে এই মিশ্রণ।

মাউথ ওয়াশ কীভাবে ব্যবহার করবেন?

মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের আগে দাঁত ব্রাশ ও দাঁতে ফ্লসিং করে নেওয়া ভালো। মাউথ ওয়াশ দুই চামচ পরিমাণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারিত পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়। মাউথ ওয়াশ ৩০ সেকেন্ডের জন্য মুখের অভ্যন্তরে রেখে কুলি করতে হয়। তবে ফ্লোরাইডযুক্ত মাউথ ওয়াশের ক্ষেত্রে এক মিনিট কুলকুচা করতে হয়। মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের ৩০ মিনিটের মধ্যে খাওয়া যাবে না। অন্যথায় মাউথ ওয়াশের কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে বা নষ্ট হয়ে যায়।

আরও পড়ুন:  ঘুম পেলে যে কারণে চোখের পর্দা ভারি হয়ে আসে

মাউথ ওয়াশ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে যেসব সমস্যা হতে পারে সেগুলো হলো

মুখের স্বাদে পরিবর্তন আসতে পারে। মুখের স্বাদের এ পরিবর্তন তিন থেকে চার ঘণ্টার জন্য হতে পারে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।দাঁতে দাগ পড়তে পারে।মুখের ভেতরে শুষ্কভাব বিরাজ করতে পারে।

মুখের ভেতরে জ্বালাপোড়া বা প্রদাহজনিত অনুভূতির সৃষ্টি হতে পারে।অতিরিক্ত ব্যবহারে মুখে ঘা বা আলসার দেখা দিতে পারে।

কী ধরনের মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করবেন?

বাংলাদেশে তৈরি যেসব মাউথ ওয়াশ রয়েছে, সেগুলোর মূল উপাদান হলো অ্যাসেনশিয়াল অয়েল, পোভিডন আয়োডিন ও ক্লোরোহেক্সিডিন। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশ মুখের প্রদাহজনিত সমস্যায় এক সপ্তাহের জন্য ব্যবহার করা যায়। তবে মাউথ ওয়াশ সমপরিমাণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মাউথ ওয়াশে থাকা মেনথলের স্বল্পমাত্রায় প্রদাহ বিনাশকারী কার্যকারিতা রয়েছে। তা ছাড়া অন্য উপাদান থাইমল অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশ মাঢ়ির রোগ ও প্ল্যাকের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশে রয়েছে ইউক্যালিপটল যৌগ, যা ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। ইউক্যালিপটাস অ্যাসেনশিয়াল অয়েল ইউক্যালিপটাস গাছের তাজা পাতা থেকে তৈরি করা হয়। ইউক্যালিপটাস অয়েল বিভিন্ন ওষুধে ব্যবহৃত হয় এবং ইউক্যালিপটল যৌগ থাকায় এটি ব্যবহৃত হয় মাউথ ওয়াশে। অ্যাসেনশিয়াল অয়েলের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, এটি মুখের যেকোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর। এ কারণেই অ্যাসেনশিয়াল অয়েল শুধু মাউথ ওয়াশ নয়, শরীরের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায়ও অনেক সময় ব্যবহৃত হয়। যারা পান সেবনে অভ্যস্ত, সাধারণত তাদের দাঁতে ও মুখে বেশি ময়লা জমে থাকে। সে ক্ষেত্রে অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশের মিথাইল স্যালিসাইলেট কার্যকর ভূমিকা রাখে।

আমাদের দেশে মাউথ ওয়াশের ক্ষেত্রে ক্লোরোহেক্সিডিন গ্লুকোনেট ০•২ শতাংশ মাঢ়ির রোগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ বেশি দিন ব্যবহার করলে দাঁতে দাগ পড়তে পারে। ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার জন্য জিহ্বায় স্বাদের পরিবর্তন আসতে পারে। রক্তশূন্যতা হলে খাবারে রুচি থাকে না, আর স্বাদও যথাযথভাবে অনুভূত হয় না। এসব ক্ষেত্রে ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা ঠিক নয়। না হলে ক্লোরোহেক্সিডিনে স্বাদ বিনাশকারী কার্যকারিতার কারণে সার্বিক মুখের অবস্থার আরও অবনতি হবে। তবে স্বাদের কোনো পরিবর্তন না হলে ক্লোরোহেক্সিড িন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যাবে।

আরও পড়ুন:  বিয়ের পর মোটা হওয়া রুখতে সহজ কিছু উপায়।

পোভিডন আয়োডিন ০•১ শতাংশ মাউথ ওয়াশও আমাদের দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন-এমন মায়েদের ক্ষেত্রে পোভিডন আয়োডিন নিয়মিত ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ শোষিত আয়োডিন প্লাসেন্টা অতিক্রম করতে পারে এবং তা মায়ের দুধে নিঃসৃত হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষার সময় পোভিডন আয়োডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যায় না। কারণ আয়োডিন শোষণের কারণে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। আয়োডিনের প্রতি সংবেদনশীলতা থাকলে পোভিডন আয়োডিন মাউথ ওয়াশের বিকল্প মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা উচিত।

অনেকেই ভাবেন মাউথ ওয়াশ তো কুলি করার জন্যই, এ জন্য এত কিছু ভাবতে হবে কেন? তাই জানা প্রয়োজন যে বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করতে বলেন ঠিকই, কিন্তু মাউথ ওয়াশ অতিরিক্ত ব্যবহারে মুখে আলসার দেখা দিতে পারে। আর মুখের আলসারজনিত অবস্থায় অতিরিক্ত বা ভুল মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের কারণে ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা সৃষ্টি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১২ বছর বয়সের নিচে কোনো মাউথ ওয়াশই ব্যবহার করা ঠিক নয়। একান্ত প্রয়োজন হলে বাসায় তৈরি কসমেটিক মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেটি ব্যবহার করতে হবে পরিমাণমতো এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। মাউথ ওয়াশের নানা দোষ-গুণ রয়েছে ঠিকই; তবে এও সত্য, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে মুখের সার্বিক অবস্থা, ত্বকের ধরন, রোগের গুরুত্ব বুঝেই মাউথ ওয়াশ বাছাই করা জরুরি। তাই মাউথ ওয়াশের ব্যবহার সম্পর্কে সবাইকেই যথেষ্ট সচেতন হতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই এর অপব্যবহার করা যাবে না।

বাংলা হেলথ কেয়ার /এসপি