গল্প : সারপ্রাইজ 

গল্প : সারপ্রাইজ 
পড়া যাবে: 6 মিনিটে

গল্প : সারপ্রাইজ 
ফারজানা আক্তার 
জুলাই ১২, ২০২০

আজকে এই বাড়িতে আমার প্রথম রাত! এই বাড়ি মানে আমার শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়ি বলতে ইচ্ছে করছে না! এই বিয়েতে আমার কোন মত ছিলো না। আমার বাবা মায়ের কাছে আমার মতামতের কখনো কোন মূল্য নেই। মেয়ে মানুষ যত তাড়াতাড়ি বিদায় করতে পারে তত মঙ্গল।

আমরা ৬ বোন, ১ ভাই। আমার নাম রিতা। আমি সবার বড়। এক ছেলের আশায় আশায় বাকি ৫বোনের আগমন। আমার বাবার একজন ছেলে সন্তান লাগবেই লাগবে। আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করে, বাবার গালাগাল শুনে অবশেষে আমাদের একমাত্র ভাইয়ের আগমন ঘটলো। সংসারে অনেকটা স্বস্তি ফিরলো।

এখন বাবার তাড়া তাড়াতাড়ি এই ৬মেয়েকে বিদায় করতে হবে। আমি সবে ভার্সিটিতে পা দিয়েছি। বাবা সেই কলেজ থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেক কান্নাকাটি করে, বাবার হাতেপায়ে ধরে এতদিন বিয়ে আটকে রেখেছি। এবার আর সম্ভব হয় নি।

এইতো গেলো বাপের বাড়ির কথা! এবার বলি কিছু নিজের কথা। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে উঠার পর একজন ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়। এখন পর্যন্ত আমাদের কোন দেখা হয় নি। চিঠির মাধ্যমে উনার সাথে আমার পরিচয়।

ভাবছেন এই যুগে এসে চিঠির মাধ্যমে কারো পরিচয় হয়! কিভাবে সম্ভব? আমিও অবাক হয়েছি উনার কাছ থেকে প্রথম চিঠি পেয়ে। ভেবেছি এই যুগে এসে কেউ কাউকে চিঠি লিখে! কৌতূহলবশত চিঠিটা খুলে পড়ি। এবং প্রথম চিঠি পড়েই উনাকে আমিও উত্তর দেই চিঠির মাধ্যমে। সেই শুরু…

প্রতি সপ্তাহে আমি একটি চিঠি পেতাম। সারা সাপ্তাহ জুড়ে সেই চিঠির অপেক্ষা করতাম। আমাদের ফোনে কোন কথা হতো না। মনের সব কথা, স্বপ্নের কথা, সারা সপ্তাহের সকল খুঁটিনাটি চিঠিতে লিখতাম। আমি প্রতিদিন একটি করে চিঠি লিখতাম। সব চিঠি একসাথে করে প্রতি সপ্তাহে পাঠাতাম।

আমার কলেজের সামনে একজন মামা চটপটি বিক্রি করতেন। সেই মামার কাছে আমরা সব বান্ধবীরা প্রতিদিন চটপটি খাই। একদিন চটপটি খেয়ে আসার সময় মামা পিছন থেকে ডাকলো আমাকে। মামার কাছে যাওয়ার পর মামা আমার হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিলো।

মামা ভয়ে ভয়ে আমার হাতে চিঠিটা দিয়ে বললো, ‘ভাগনি, আমার উপর রাগ কইরেন না। এক মামা আজকে কয়দিন ধইরা আমারে জোর করতাছে আপনারে এটা দেওয়ার লাইগ্গা। উনারে দেইখ্যা আমারে ভালোই মনে হইলো। তাই আজকে সাহস কইরা আপনারা দিলাম।’

চটপটি মামার ভয় ভয় চেহারা আর কথার ধরণ দেখে আমি হেসে দিলাম। বান্ধবীরা তখন জোর করেছিলো কি লেখা আছে দেখার জন্য। আমি বলেছিলাম পরে তাদের জানাবো। সত্যি বলতে যখন থেকে বুঝতে শিখেছি। প্রেম, ভালোবাসা সম্পর্কে জেনেছি তখন থেকে মনে হতো আমার একটা প্রেম হবে। চিঠি লেখার প্রেম। কাগজে লেখা শব্দ, বাক্য পড়ে পড়ে সেই মানুষটাকে অনুভব করবো। আমাদের ভাব বিনিময় হবে অক্ষরের মাধ্যমে।

যখনই মন খারাপ হবে অথবা খুব ভালো থাকবে তখন কাগজে লিখে ফেলবো। ভালো, খারাপ মুহূর্তটা কাগজে বন্দি হয়ে গেলো। কাগজটা যখন তার কাছে চলে যাবে তখন সে জানবে দিনের কোন ভাগে আমার মন খারাপ ছিলো, আর কোন ভাগে ভালো ছিলো।ফোনে কথা বললে সাথে সাথে মুহূর্ত শেয়ার করে শেষ হয়ে যায়। ছবি তোলে, ভিডিও করে যেমন সবাই নিজেদের মুহূর্ত বন্দি করে। কাগজেও তেমনি নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, ভাবনা সব বন্দি করে রাখা যায়।

তাই, সোস্যাল মিডিয়ার যুগে চিঠি পেয়ে আমার মনে কিছুটা উত্তেজনা কাজ করছিলো। বাসায় গিয়ে ফ্রেশ না হয়ে আগে চিঠিটা খুললাম। শুরুতে লেখা!

প্রিয় নাম জানি কিন্ত লিখলাম না,

নামটা জেনেও কেন লিখলাম না জানেন? আমি আপনার নামটা অন্যের মুখে শুনেছি তাই লিখলাম না। আপনি যদি আমার চিঠির উত্তর দেন তাহলে নিজের পুরো পরিচয়টা লিখবেন। আপনি নিজ থেকে পরিচয় দিলে আমি আপনার নাম ধরে চিঠি লিখবো। কখনো দেখা করার সৌভাগ্য হলে তখন ডাকবো।

আরও পড়ুন:  এই করোনাকালে বাজারে কেনাকাটা থেকে ফিরে সুরক্ষিত থাকতে এইসকল অভ্যাস জরুরি

এই চিঠিটা কোন প্রেমপত্র নয়। পরিচয় পত্র। আমি আমার পরিচয় জানিয়ে আপনাকে চিঠি লিখলাম। আমাদের পরিচয়টা চিঠিতে হোক। আপনার পরিচয়ের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো কথা আমি কিন্তু খুব ধৈর্যশীল! আপনার চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে আমার ভালো লাগবে।

ইতি,

আসিফ

মাত্র কয়েক লাইনের চিঠিটা এতো মায়া নিয়ে লেখা। আমি পর পর কয়েকবার পড়েছিলাম। হয়তো তখন আবেগটাও বেশি ছিলো! আমি কোন সাত পাঁচ না ভেবে চিঠির উত্তর লিখেছিলাম। পরেরদিন মামার হাতে চিঠি দিয়ে বলেছিলাম সেই লোককে দিতে। সেই থেকে মামা আমাদের পিয়ন হয়ে গেলেন।

আসিফ আমাকে চিনতো, জানতো এবং দেখতো। আমি আসিফকে যতটুকু চিনেছি, জেনেছি সব চিঠির মাধ্যমে। কখনো দেখি নি। সাপ্তাহের একদিন চিঠি দেওয়ার নিয়মটা আসিফের।

আসিফ বলতো সবকিছু রয়ে সয়ে হোক। যে সম্পর্ক খুব দ্রুত আগাবে, সেটা আবার তত দ্রুত পিছাবে। আসিফকে আমার দেখতে খুব ইচ্ছে হতো কিন্তু নিজ থেকে বলতে খুব লজ্জা পেতাম। আসিফও নিজ থেকে দেখা করার কথা কখনো বলতো না। বলবে কেন! সে তো আমাকে ঠিকই দেখে। আমি শুধু তাকে দেখি না! ভুল বললাম। কল্পনায় দেখি…

এভাবে আমাদের দিন খুব ভালো কাটছিলো। হুট করে বাবা এসে বললেন আমার বিয়ে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বলা নেই, কওয়া নেই , কেউ দেখতেও আসে নি। বিয়ে মানে?

বাবা জানালেন ছেলে বিদেশে থাকে। আমার ছবি তাকে পাঠিয়েছিলেন। ছেলে আমার ছবি পছন্দ করেছে। ছেলের পরিবারও রাজি। গত শুক্রবার ছেলে দেশে এসেছে। ছুটি অল্পদিনের।

তাই তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে নিতে চাচ্ছে। আমার কান্না আর আমার মায়ের বাঁধা কোনোকিছুই সেই বিয়ে আটকাতে পারে নি। চোখের পলকে সব হয়ে গেলো। আমার বাড়িতে বিয়ের কোন সাজসজ্জা না হলেও এই বাড়িতে এসে দেখি বাড়িঘর খুব সুন্দর করে সাজানো। এই বাড়িটা দেখলে মনে হবে বিয়ে খুব ধুমধাম করে হয়েছে। আর , আমার বাপের বাড়ির দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না এটা বিয়ে বাড়ি।

বাবা যেদিন বিয়ের কথা জানালেন তার দুইদিন পর আমার বিয়ে হয়ে গেলো। আসিফকে আমি কিছু জানাতে পর্যন্ত পারি নি। নিজেকে নিজের কাছে প্রতারক মনে হচ্ছে। বড্ড রাগ হচ্ছে! আসিফের ফোন নাম্বার জানা থাকলে ফোন করতে পারতাম। কিন্তু সেটাও আমার নেওয়া হয় নি। এখন আমি বাসর ঘরে বসে আছি। মনে হলো রুমে কেউ ঢুকেছে!

‘ মন খারাপ? ‘ যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তিনি রুমে আসলেন। এসেই আমাকে প্রশ্নটা করলেন।

আমি উত্তর দিলাম না।

‘কথা বলবেন না?’ আবার প্রশ্ন

এবারো আমি উত্তর দিলাম না।

‘আসিফের জন্য খারাপ লাগছে?’

আমি চমকে তার দিকে তাকালাম। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,’আপনি আসিফকে চিনেন ?’

‘এইতো বউয়ের মুখে কথা ফুটেছে।’ কথাটা বলে তিনি হাসলেন। ভিলেন মার্কা হাসি।

হেয়ালীপনা না করে বলবেন আসিফকে কিভাবে চিনেন ?

‘যাকে বিয়ে করছি তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিবো না ? খোঁজ খবর নেওয়ার সময় আসিফ সম্পর্কে জানলাম। ‘ তিনি উত্তর দিলেন। আসিফ সম্পর্কে জেনেও আপনি আমাকে বিয়ে করলেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘লাল শাড়িতে তোমাকে সুন্দর লাগছে। ‘ আমার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে তিনি বললেন।

আমি বুঝতে পারলাম তিনি এখন স্বামীর অধিকারের নিয়ে আগাবেন। ভিতরে ভিতরে যেমন বাজে লাগছিলো আমার। আমার ভাবনা মিথ্যে করে দিয়ে তিনি বারান্দায় চলে গেলেন। একটু পর ফিরে এসে বললেন আকাশে চাঁদ উঠেছে। বারান্দায় আসো। দুইজন চাঁদ দেখবো।

শুরুতে লোকটা আমাকে আপনি আপনি বললেও হুট্ করে তুমি তুমি বলছে। আমি বললাম চাঁদ দেখবো না।

‘আমি যদি আসিফ হতাম তাহলেও চাঁদ দেখতে না?’

আমি রাগে কটমট করে এবার উনার দিকে তাকালাম। তারপর বললাম আপনি একটু বেশি কথা বলছেন।

আরও পড়ুন:  ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা কী?

‘আচ্ছা! তাই? রিতা তুমি একটু বেশিই সুন্দর। রাগলে আরো কয়েকগুন বেশি সুন্দরী হয়ে যাও। ‘

আমি চুপচাপ আছি।

হুট করে তিনি আমার খুব সামনে চলে এসে আমার হাতটা ধরেন। আমি সরিয়ে নিতে চাইলে আরো জোরে হাত চেপে ধরেন। তারপর টেনে বারান্দায় নিয়ে যান। আমার তখন রাগে দুঃখে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। মনে মনে ভাবছিলাম কেমন করে থাকবো এমন লোকের সাথে আমি!

হুট করে তিনি বললেন, ‘কাঁদো কাঁদো যত ইচ্ছে কাঁদো! এরপর তো আর কাঁদতে পারবে না। এই আসিফ তোমাকে আর কখনো কাঁদতে দিবে না। ‘

আমি চমকে তার দিকে তাকিয়ে কোন রকমে প্রশ্ন করলাম, মানে ?

তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘আমি কখনোই বিদেশ ছিলাম না। আমি একজন ডাক্তার। ৩ বছর আগে তোমাদের এলাকায় আমার পোস্টিং হয়। এখানে আসার কয়েকদিন পর তুমি, আমার শ্বাশুড়ি আর আমার একমাত্র শ্যালক আমার কাছে আসো। শ্যালকের জ্বর ছিলো। তখন তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়। বাসা থেকে বিয়ের জন্য প্রেশার ছিলো। সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করলে তোমাকেই করবো।

তোমার সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করি। তোমার বাসার স্কুলের দারোয়ান, তোমার বোন, বান্ধবী, চটপটি ঝালমুড়ি ফুসকা মামা থেকে সবাইকে একে একে নিজের দলে নিয়ে অবশেষে তোমার রাগী বাবাকেও আমার দলে নিয়ে আসলাম। যখন যাকে যা শিখিয়ে দিয়েছে তারা তাই তোমাকে বলেছে। তবে আমার শ্বশুর সত্যি খুব ভালো অভিনয় করেছেন। তিনি অভিনেতা হলে খুব ভালো হতেন। হাহাহাহাহা! ‘

আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আমার বাবা!!!!!!! কিভাবে কী!

তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘তুমি বড্ড অভিমানী রিতা! বাবা জোর করে বিয়ে দিচ্ছে পাত্রের ছবি দেখবা না? নামটাও জানবা না? বাবাকে না বলেই চলে আসলে ? চলো নিচে সবাই আছে। সবার সাথে দেখা করে আসবা। ‘

নিচে গিয়ে দেখি বাবা, মা, বোন ভাই চটপটি মামা থেকে শুরু করে সবাই উপস্থিত। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। বাবা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘মানুষ কি চিরকালই খারাপ থাকে রে, মা? আমি তোদের কখনো ভালো বাবা ছিলাম না। কখনো ভালো স্বামীও ছিলাম না। সবসময় নিজের ইচ্ছে সবার উপর চাপিয়ে দিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি আমি কতবড় ভুল করেছি। আজকে সবার সামনে কথা দিলাম নিজের সবটুকু ভুল আমি শুধরে নিবো। নিজেকে বদলে নিবো। ‘

আমার নিজের কাছে সব স্বপ্নের মতো লাগছিলো। যে বাবাকে এতো বছর আমরা বদলাতে পারি নি। আসিফ সেই কাজটুকু কত অল্প সময়ে করে দিয়েছে। এই ছেলেটা কি জাদু জানে? এই প্রথম আমি ভালো করে আসিফের দিকে তাকালাম। কি মায়াবী একটা মুখ!!!! মুখে বিজয়ীর হাসি। এই মানুষটা আজকে থেকে আমার ভাবতেই কেমন অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে।

সবার সাথে গল্প করতে করতে রাত প্রায় শেষ হয়ে আসলো। সবাইকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে আমি আর আসিফ আমাদের রুমে আসলাম। রুমে এসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এতো কাহিনীর কি কোন প্রয়োজন ছিলো ?’

‘অবশ্যই ছিলো!’ আসিফ উত্তর দিলো

কেন প্রয়োজন ছিলো ? আমি জিজ্ঞেস করলাম

‘তুমি শুরুর দিকে চিঠিতে লিখেছিলে তুমি খুব সারপ্রাইজ পেতে পছন্দ করো। তুমি চাও যে তোমার জীবনসঙ্গী হবে সে যেন তোমাকে সবসময় ছোট খাটো সারপ্রাইজ দেয়। তাই আমাদের দুইজনের জীবনের শুরুতে একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ দিলাম তোমাকে। ‘ আসিফ উত্তর দিলো

এটা ছোট সারপ্রাইজ ? আমি আর সারপ্রাইজ পেতে চাই না।

‘সারপ্রাইজ তো এখনো আরো অনেক বাকি আছে। ওয়েট ওয়েট আমি একটু আসছি…’

এইদিকে ফজরের আজান হচ্ছে। আমি আসিফের নেক্সট সারপ্রাইজের জন্য অপেক্ষা করছি।

#গল্প_সারপ্রাইজ

লেখা : ফারজানা আক্তার 

ছবি : ইয়াসিন প্রধান সাজিদ 

বাংলা হেলথ কেয়ার /এসপি

  • 1
    Share